Loading...

জ্যোতির্বিজ্ঞান বা জ্যোতির্বিদ্যাঃ বিজ্ঞানের এক আশ্চর্য শাখা

Support Us or Donate Some Love for Us



জ্যোতির্বিদ্যা বা জ্যোতির্বিজ্ঞান (Astronomy)মহাবিশ্বে বিরাজমান গ্রহ, নক্ষত্র ও অন্যান্য জ্যোতিষ্কের গতি-প্রকৃতি সমন্ধীয় বিদ্যা। বিজ্ঞানের প্রাচীনতম শাখাসমূহের অন্যতম হচ্ছে জ্যোতির্বিদ্যা বা জ্যোতির্বিজ্ঞান। প্রাচীনকালের বহু সভ্যতায়ই জ্যোতিষ্কসমূহের নিয়মপূর্ণ গতিবিধি পন্ডিতদের কাছে পরম কৌতূহলের বিষয় ছিল। প্রাচীন পন্ডিতবর্গ সূর্য, চন্দ্র ও গ্রহাদির পারস্পরিক স্থান পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করে লিপিবদ্ধ করে রাখতেন এবং তা থেকে ভবিষ্যৎ ঘটনাবলি সম্পর্কে পূর্বাভাস দেওয়ার চেষ্টা করতেন। আদিতে পন্ডিতগণ জ্যোতিষ্কসমূহের গতিবিধি ও আবর্তন পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে কাল গণনা (দিন, মাস ও বছর) সূচনা করেন এবং এর ভিত্তিতেই বর্ষপঞ্জি গণনাপদ্ধতির উদ্ভব হয়।পরবর্তীতে জ্যোতির্বিদ্যা চর্চালব্ধ জ্ঞান নৌচালনায় বিশেষ করে দিক নির্ণয়ে অপরিহার্য হয়ে দাঁড়ায়।

জ্যোতির্বিজ্ঞান সম্ভবত পৃথিবীর প্রাচীনতম প্রাকৃতিক বিজ্ঞান।এর ইতিহাস বিশ্লেষণ করতে গেলে ফিরে যেতে হয় সুপ্রাচীন কালে যখন মানুষ কেবল ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান দ্বারা প্রভাবান্বিত হয়ে জ্যোতির্বিজ্ঞান চর্চা করতে। সেই ধর্মীয় যুগের ছোয়া এখনও জ্যোতিষ শাস্ত্রে পাওয়া যায়। জ্যোতিষ শাস্ত্র দীর্ঘদিন ধরে জ্যোতির্বিজ্ঞানের সাথেই চর্চা করা হতো, পশ্চিমা বিশ্বে ১৭৫০ – ১৮০০ সালের মাঝামাঝি সময়ে এই দুইটি শাস্ত্র পৃথক হয়ে যায়। প্রাচীনকালে জ্যোতির্বিজ্ঞান চর্চা বলতে বুঝাতো খালি চোখে দৃশ্যমান খ-বস্তু যেমন, সূর্য, চন্দ্র, তারা ইত্যাদি পর্যবেক্ষণ। এর উৎকৃষ্ট প্রমাণ হলো কৃষিভিত্তিক পঞ্জিকা। মূলত দিগন্তের বিভিন্ন অংশে সূর্যের অবস্থানের পরিবর্তন এবং তারাসমূহের আপেক্ষিক অবস্থানের পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করতে যেয়েই বর্ষ গণনা পদ্ধতির আবির্ভাব হয়। কোন কোন সভ্যতায় এই জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক উপাত্তসমূহই জ্যোতিষ শাস্ত্রের ভবিষ্যৎ বলায় ব্যবহৃত হতো।

প্রাচীন জ্যোতির্বিজ্ঞান সীমায়িত ছিল খালি চোখে দৃশ্যমান মহাজাগতিক বস্তুগুলির পর্যবেক্ষণ ও সেগুলির গতিবিধি সংক্রান্ত ভবিষ্যদ্বাণীর মধ্যেই। অনুমিত হয়, একাধিক প্রাচীন সভ্যতার অধিবাসীবৃন্দ জ্যোতির্বিজ্ঞান সংক্রান্ত পর্যবেক্ষণের উদ্দেশ্যে প্রচুরি যন্ত্রপাতি জোগাড় করেছিল। প্রথাগত আকাশ পর্যবেক্ষণের কাজ ছাড়াও সেই যুগের মানমন্দিরগুলিতে ঋতুনির্ণয়ের মাধ্যমে শস্যরোপনের সময় নির্ধারণ ও বছরের দৈর্ঘ্য মাপার কাজও চলত। কৃষিকার্যের ক্ষেত্রে এই দু’টি কাজ সেকালে ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।টেলিস্কোপ প্রভৃতি যন্ত্রপাতি আবিষ্কারের আগে পর্যন্ত নক্ষত্র পর্যবেক্ষণের কাজটি করা হত খালি চোখে। প্রাচীন মেসোপটেমিয়া, গ্রিস, পারস্য, ভারত, মিশর ও মধ্য আমেরিকায় জ্যোতির্বিজ্ঞান সংক্রান্ত গবেষণার জন্য একাধিক মানমন্দির গড়ে তোলা হয়েছিল এবং মহাবিশ্বের প্রকৃতি সম্পর্কে বিভিন্ন ধারণা নিয়ে পর্যালোচনার কাজ শুরু হয়েছিল।

মধ্যযুগের ইউরোপে খ্রিস্টীয় ১৩শ শতাব্দী পর্যন্ত জ্যোতির্বিজ্ঞানের চর্চা থমকে ছিল। অবশ্য এই সময় ইসলামি বিশ্বে এবং অন্যান্য অঞ্চলে জ্যোতির্বিজ্ঞান চর্চার যথেষ্ট অগ্রগতিও হয়েছিল। ৯ম শতাব্দীর গোড়ার দিকে ইসলামি বিশ্বে প্রথম জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক মানমন্দিরগুলি গড়ে ওঠে।৯৬৪ খ্রিষ্টাব্দে পারস্যদেশীয় জ্যোতির্বিজ্ঞানী আজোফি তার বুক অফ ফিক্সড স্টারস গ্রন্থে স্থানীয় জোটের বৃহত্তম ছায়াপথ অ্যান্ড্রোমিডার বর্ণনা দেন।১০০৬ খ্রিষ্টাব্দে মিশরীয় আরব জ্যোতির্বিজ্ঞানী আলি ইবন রিদওয়ান ও চিনা জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা লিপিবদ্ধ ইতিহাসের উজ্জ্বলতম অ্যাপারেন্ট ম্যাগনিচিউড তারাজাগতিক ঘটনা এসএন ১০০৬ অতিনবতারা পর্যবেক্ষণ করেন।

জ্যোতিঃ পদার্থবিজ্ঞানের যুগোপযোগী চর্চার ফলে জ্যোতির্বিজ্ঞানের পরিসর বিংশ শতাব্দীতে ব্যাপক প্রসারিত হয়েছে। মূলত বিংশ শতাব্দীকেই জ্যোতির্বিজ্ঞানের সূচনা, বিকাশ এবং পরিপক্বতার যুগ বলে অভিহিত করা চলে। তার উপর পারমাণবিক বিক্রিয়ার মৌলিক বৈশিষ্ট্যসমূহ আবিষ্কৃত হওয়ার ফলে বিভিন্ন নক্ষত্রের অভ্যন্তরে কিভাবে শক্তি উৎপন্ন হচ্ছে তার স্বরূপ বোঝা গেছে। এর অব্যবহিত ফল হিসেবেই মহাবিশ্বের শক্তির উৎস সম্বন্ধে বিস্তারিত গবেষণা করা সম্ভব হয়েছে এবং জন্ম হয়েছে বিশ্বতত্ত্বের (Cosmology)। বিশ্বতত্ত্বের মূল আলোচ্য বিষয় মহাবিশ্বের উৎপত্তি এবং বিবর্তন। এ সব কিছুর ফলেই আমরা আজ জানি যে, পৃথিবীতে প্রাপ্ত পরমাণুগুলো মহাবিশ্বের বিবর্তনের এমন একটি সময়ে সৃষ্টি হয়েছিল যখন ধূলিমেঘ ছাড়া আর কোন কিছুরই অস্তিত্ব ছিল না। আর সেই ধূলিমেঘের মধ্যে প্রথমে কেবল হাইড্রোজেনেরই অস্তিত্ব ছিল। এভাবেই এই বিজ্ঞান অনেকদূর এগিয়ে গেছে যা একই সাথে মানুষকে এগিয়ে রাখার ক্ষেত্রে সবচেয়ে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে; কারণ জ্যোতির্বিজ্ঞানের মাধ্যমেই সবচেয়ে সফল ভবিষ্যদ্বাণী করা সম্ভব।

তবে জ্যোতির্বিজ্ঞানের সর্বপ্রধান সীমাবদ্ধতা বা অন্য যাই বলা হোক না কেন তা হল এটি এখনও একটি খাঁটি পর্যবেক্ষণমূলক বিজ্ঞান। অনেক দূরবর্তী বস্তুসমূহ নিয়ে গবেষণা করতে হয় বিধায় এতে পরীক্ষণের সুযোগ খুবই সীমিত। তাছাড়া যে বস্তুসমূহ নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা করতে হয় সেগুলোর তাপমাত্রা, চাপ বা রাসায়নিক গঠন সম্পর্কে কোনও তথ্যকেন্দ্রিক নিয়ন্ত্রণ থাকা সম্ভব নয়। তবে বর্তমান যুগে এই বিজ্ঞানের বেশ কয়েকটি উল্লেখযোগ্য পরীক্ষণ চালনা সম্ভব হয়েছে; যেমন: ভূপৃষ্ঠে পতিত উল্কাপিণ্ড, পাথর বা চাঁদ থেকে নিয়ে আসা মাটি নিয়ে বিস্তর গবেষণা সম্ভব হয়েছে। এর সাথে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের স্ট্র্যাটোস্ফিয়ার স্তরে প্রাপ্ত ধূলিকণা নিয়ে গবেষণাও এর অন্তর্ভুক্ত। এভাবে জ্যোতির্বিদ্যা পর্যবেক্ষণ ক্ষেত্রেও প্রসিদ্ধি লাভ করছে। ভবিষ্যতে হয়তোবা ধূমকেতুর ধূলিকণা বা মঙ্গল গ্রহের মাটি নিয়ে মহাশূন্যযানে বসেই গবেষণা করা যাবে। তবে এসব গবেষণার বেশির ভাগই পৃথিবীকেন্দ্রিক। পর্যবেক্ষণকাজে বিজ্ঞানের অন্য শাখাসমূহের সাহায্য এখানে মুখ্য। সহযোগী শাখাসমূহের মধ্যে আছে পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, অণুজীববিজ্ঞান, প্রত্নতত্ত্ব ইত্যাদি।