Loading...

নিয়তি

Support Us or Donate Some Love for Us



টি.এস.সি নামকরণটা কি  ছাত্র শিক্ষক কেন্দ্রের পাশাপাশি হরেক রকম  চায়ের জন্য হয়েছিলো?  ওটা টি সার্ভিস সেন্টারের সংক্ষিপ্ত রুপ হতে পারে কি? ভাবতেই মনে মনে একচোট  হেসে নিলাম আমি। 

 অসাধারণ সব চায়ের আড্ডা আর দারুণ সব আইডিয়ার উৎপত্তিস্থল এই জায়গাটা।  ইদানীং  বিভিন্ন ধরণের চায়ের উৎপাত দেখেও সেরকমটা মনে হচ্ছিলো আমার৷  যদিও সেটা যে খুব আহামরি সমস্যা তা নয়।  কিন্তু গোলমালটা বাঁধে সোশাল মিডিয়ায় সবকিছু নিয়ে অহেতুক কচলাতে কচলাতে ঠিক যখন তিতকুটে  লেবু চা বানিয়ে ফেলা হয় সেটা নিয়ে।

 চা নিয়ে বাঙালির আবেগটা অন্যরকম৷  নির্দোষ নেশাগুলোর মধ্যে চা একটি।  যদি বাড়তি চিনি বা কৌটোর দুধের ব্যাপারটা না থাকে তবে চায়ের মতো এমন উপাদেয় পানীয় আর দ্বিতীয়টি নেই৷  চায়ে প্রথম দুধের প্রচলন করে ভারতের আসামের অধিবাসীরা৷  আসামের চায়ের রং হতো গাঢ় কালো৷  স্বাদেও প্রবল তিতকুটে একটা ভাব ছিলো৷  তাই স্বাদ বাড়াতে এই অতিরিক্ত দুধ মিশ্রনের প্রক্রিয়া শুরু হয়৷   

রবি ঠাকুরের ভাষায় “ যাহাতে নাই কোন মাদকতা দোষ যাহা পানে হয় চিত্ত পরিতোষ। ”

 চীনে ২০০ খ্রিস্ট-পূর্বাব্দে চা পান শুরু। তারপর চা নিয়ে কম পরীক্ষানিরীক্ষা হয়নি৷   

মানুষ বরাবরই রঙ্গিন বস্তুর প্রতি এক অমোঘ টান অনুভব করে আসছে৷  সেই রংটা যদি প্রিয় পানীয়তে পাওয়া যায় তাহলে তা সহজেই আরো বেশি আকর্ষণীয় হয়ে উঠবে তা আর বলতে হয়? অপরাজিতা চা ঠিক এভাবেই কয়েকদিনের মধ্যে সবার পরিচিত হয়ে উঠেছে৷ ঈষৎ বেগুনি রঙ এর চা দেখতেও অদ্ভুত সুন্দর লাগে৷  কিন্তু এই জিনিসটাকে ঠিক চা বলা যায় না৷  অপরাজিতা ফুলের পাপড়ীর নির্যাস বলা যেতে পারে।  কারণ চা পাতা এখানে অনুপস্থিত।  এই ফুলের আরেকটা সুন্দর নাম হচ্ছে নীলকন্ঠ। 

এই নীলকন্ঠের রস পান করতে করতে বন্ধুদের সাথে আড্ডা জমে উঠছিলো৷  আড্ডায় ছেদ পড়লো একটা গালাগালির শব্দে৷

“ এই!!  চায়ে কি মিশাইছস?  পেটের ব্যাদনায় বাঁচি না আমি! “

আমরা যে দোকান থেকে চা খাচ্ছি সেখানেই ঝগড়া হচ্ছে চা ওয়ালা আর একটা বৃদ্ধের।  খানিক কথাবার্তা শুনে যা বুঝলাম রিকশাওয়ালা এই বৃদ্ধ শখ করে কাল এই বিখ্যাত অপরাজিতা চা পান করেছিলেন এবং এরপর কিছু সময়ের মধ্যেই তার পেটে গোলমাল শুরু হয়৷  সেটা আজ অব্দি ঠিক হয়নি৷ 

চা ওয়ালা বোঝানোর চেষ্টা করছেন “ বুইড়া কোথাকার , তুই খালি আমার  চা ই খাইছস? এরফর  আর কিছু খাছ নাই? হুদাই আমারে দোষ দিতাছস ক্যান? তুই ক্যামনে বুঝলি চায়ের লাইগা এইরাম হইছে?  ”   

“ তোর চা খাওনের পর  থেইকা আমি আর কিছু মুহে দিতে পারিনাই হারামজাদা!  ”     

ঝগড়ার তেজ বাড়ছে দেখে আমরা এগিয়ে গেলাম৷  অনেক কষ্টে দুইপক্ষকে বুঝিয়ে থামাতে হলো৷  রিকশাওয়ালা বৃদ্ধকে পেটের ব্যামোর ওষুধ কেনার টাকা ধরিয়ে দিয়ে বিদায় করলাম। 

চা ওয়ালা হারুন মামা বললেন “ দেহেন তো মামা,  বুইড়া কি কয়! আমি নাহি চায়ে কিছু মিশাইছি৷ কি মিশামু কন?  ”

এটা আমার অনুসন্ধিৎসু চোখের কারণে কি না জানিনা মনে হলো চায়ের দোকানদার কিছু একটা ব্যাপার সযত্নে এড়িয়ে গেলেন। 

আমরা আর কথা বাড়ালাম না৷ চা থেকে পেটের অসুখ খুব কমই হয়৷  বরং সকালবেলার আদা চা পেটের সমস্যা দূরে রাখে বলেই জানি৷ 

বোটানীতে পড়া বন্ধু শাকিলের কাছে জেনেছিলাম অপরাজিতা চায়ে নাকি ফ্ল্যাভিনয়েড না কি যেন থাকে।  বৃদ্ধের অসুখ  ঐ উপাদানের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নয় তো? 

এরপর আরো এক সপ্তাহ কেটে গিয়েছে৷  আবার ঐ চায়ের দোকানে চা খেতে বসেছি৷ কিন্তু দোকানে মামা নেই।  তার বদলে তার ছেলে দোকান চালাচ্ছে৷  আমি জিজ্ঞেস করাতে বললো “ আব্বারে পরশুদিন বিহানবেলা পুলিশে ধইরা নিয়া গেছে৷  ”

ছেলেটা এমন নির্লিপ্ততা নিয়ে কথাটা বললো যেন তার বাবার জেলে যাওয়াটা খুব স্বাভাবিক ব্যাপার৷  বিস্তারিত জানতে চাওয়ায় যতটুকু শুনলাম সেটা হলো

“ পরশুদিন  স্থানীয় এক রিকশাওয়ালা নাকি পেটের অসুখে ভুগে মারা গেছে।  সে মরার আগে  নাকি আয়োজন করে পুলিশ ডাকিয়ে  সবাইকে জানিয়ে গিয়েছে  যে চাওয়ালা

 “ হারুইন্নার ”  ফুলের চা খেয়েই তার  অসুস্থতার শুরু এবং তার মৃত্যুর জন্য একমাত্র হারুনই দায়ী।  আইনী ভাষায়

“ ডেথ বেড কনফেশন ” নামে একটা শব্দ আছে।  মৃত্যুশয্যায় কেউ যদি বলে তার মৃত্যুর জন্য অমুক দায়ী তাহলে তাকে দোষী সাব্যস্ত করতে স্বাভাবিকের তুলনায় কম প্রমাণ দরকার হয়।

আমার দুটো কারণে মনে হলো একবার থানায় যোগাযোগ করে ব্যাপারটা জানা দরকার। 

এক,  এই চায়ে কি সত্যিই মরণঘাতী কোন উপাদান রয়েছে?  থাকলে সবাইকে সতর্ক করা প্রয়োজন। 

দুই, হারুন মামার সাথে  পূর্বশত্রুতার   জের ধরে ঐ রিকশাওয়ালা বিকৃত এই ফাঁদ পেতে যায়নি তো?  অশিক্ষিত মানুষের ঘৃণা মাঝেমধ্যে ভয়ানক রুপ নেয়। 

কোতোয়ালি থানায় ভিড় থাকাটা স্বাভাবিক।  সরাসরি ওসির সাথে কথা বলবো।  ভার্সিটিতে পড়ার একটা সুবিধা হলো যেখানেই যাই কাকতালীয়ভাবে পরিচিত মানুষ পাওয়া যায়।  এবারো তাই। একেবারে নিজের ডিপার্টমেন্ট!    ওসির নাম রফিকুল ইসলাম।  আমাদের দুই ব্যাচ সিনিয়র।  পরিচয় পেয়েই আদর করে বসালেন।  চা নাস্তার তোড়জোড় শুরু হলো।  মূল আলাপে   আসার আগে ক্যাম্পাসের সার্বিক খোঁজখবর দিতে হলো। 

হারুনের কেসটা তার তত্বাবধানেই আছে।  এমন বিচিত্র কেস তিনি নিজেও খুব কম দেখেছেন। পোস্ট-মর্টেম রিপোর্টে অদ্ভুত সব তথ্য বের হয়ে এসেছে।  রিকশাওয়ালার নাম বদরুল।  বদরুলের পরিবারের দাবী তার কোনদিন কোন পেটের বড় সমস্যা ছিলো না।  যদিও এই দাবী খুব শক্ত কিছু না।  কারণ থাকলেও গরীব মানুষ চিকিৎসার খরচের ভয়ে অনেক অসুখ এমনিতেই চেপে যায়। 

ফরেনসিক রিপোর্টে বদরুলের পেটে আলসার জাতীয় কিছুর উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে। সোজা বাংলায় অন্ত্রনালীতে ঘা৷   নাড়ীভুঁড়ির ভেতরে হাইড্রোক্লোরিক এসিড ক্ষরিত হয়ে নালীর গায়ে একটা গভীর ক্ষতের সৃষ্টি করে।  যেটা কিছু বিশেষ খাবারের প্রভাবে নিয়মিত বাড়তে থাকে৷ 

“ এই যে দুধ চা খাচ্ছি এটাও কিন্তু  আলসারের সম্ভাবনা বাড়ায় ”  বলে খানিকটা অপরাধীর ভঙ্গিতে   চায়ের কাপে ছোট একটা চুমুক দিলেন রফিক ভাই।  তারপর আবার শুরু করলেন। 

“ বদরুল আর দশটা লো ক্লাস মানুষের মতনই বিড়ি টানতো। কড়া জর্দা দিয়ে পান খেতো৷   হয়তো সুযোগ পেলে সস্তা গাঁজাতেও হাত দিতো।  তাতে সবার এফেক্ট  না হলেও কিছু মানুষের ওতে ক্যান্সার হয়।  আর ক্যান্সারের উৎপত্তি হয় টিউমার থেকে।  মানে যেকোন ধরণের অনিয়ন্ত্রিত কোষ বিভাজন থেকে আরকি ৷ বদরুলের বডিতে আলসারের পাশাপাশি পাখির ডিমের সাইজের একটা টিউমার ছিলো৷  ফরেনসিক ডাক্তার বলেছেন এরকম আকারের টিউমার তারা আগে কোনদিন দেখেননি৷  অনেকটা খোলসভাঙ্গা ডিমের মতন। 

সার্বিকভাবে যেটা বলতে চাচ্ছি সেটা হলো বদরুলের  মৃত্যু ওর দৈনিক বদভ্যাসের ফলাফল হওয়াটা মোটামুটিভাবে স্বাভাবিক৷  পাশাপাশি ওর বয়স হয়েছিলো৷ বার্ধক্যজনিত মৃত্যু হওয়াটাও অস্বাভাবিক নয়৷ এখন আসা যাক ও হারুনকে কেন দায়ী করে গেলো৷  এমন তো নয় যে হারুনের চা খেয়ে বদরুল ছাড়াও অন্য কেউ মরেছে বা কোনরকম অসুস্থ হয়েছে৷

অন্তত হাজারখানেক মানুষ ওর দোকানে নিয়মিত চা খেয়েছে৷  কই কেউ তো অভিযোগ জানায়নি৷  আর চায়ের মতন একটা পানীয়তে এমন কী যুক্ত করা যেতে পারে যা মানুষকে আলসারের দিকে টেনে নিয়ে যাবে এত দ্রুত!

শুধু একটা কথা দাবী করা যায়৷  সরাসরি চায়ের মধ্যে  বিষ প্রয়োগ৷  কিন্তু এখানেও একটা বিতর্ক থেকেই যায়৷ চায়ে বিষ থাকলে সেটার প্রভাব এত দেরীতে হলো কেন? যদি স্লো পয়জন   ধরে নিই তাহলে সেটা যোগাড় করা হারুনের মতন মানুষের পক্ষে কষ্টকর৷ কারণ স্লো পয়জন সংগ্রহ করাটা ব্যায়বহুল৷ 

তবুও ধরে নিলাম হারুনকে কেউ সেটা নিজের উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য এনে দিয়েছে।  কিন্তু সামান্য একটা রিকশাওয়ালাকে মারার জন্য কার এতো জিঘাংসা কাজ করছে?     

তুমি এসে ভালোই করেছো৷  হারুন তো তোমার পরিচিত তাই না?  ভালোরকম পরিচিত বলেই দেখতে এসেছো।  তুমি ওকে একটু আশ্বাস দাও৷  বিশ্বাস জমিয়ে কিছু প্রশ্ন করো৷  দেখো কিছু তথ্য বের করে আনা যায় কিনা। 

“ আমি? ”     খানিকটা ইতস্ততভাবে বললাম আমি৷ ওকে ঐ নিয়মিত চা খেতে গিয়েই যতটা চিনেছি৷  হারুন মামাও আমাকে মুখ চেনা চেনে৷  আমায় সেভাবে বিশ্বাস করবে?  ”

“ বিশ্বাস করতে বাধ্য। কারণ আর কেউ একটা সাধারণ  চা ওয়ালার জন্য  কষ্ট   করে থানা পর্যন্ত আসেনি৷  ওর নিজের আত্মীয়রাও তো বেশি একটা খোঁজখবরের নেয়নি৷  আমি চাইছি গরীব মানুষটার একটা গতি হোক৷  নইলে কোর্টকাচারীর ঝামেলা তো জানোই৷  ফাঁসির সম্ভাবনা কম কিন্তু যাবজ্জীবন হলেও তো ক্ষতিটা খুব কমে যাচ্ছে না৷  যদি ইচ্ছাকৃতভাবে  বিষ না দিয়ে থাকে তাহলে তো সে নিরপরাধ।  আর এর পেছনে বড় কোন চক্র থাকলে আমরা তাদের নাগালও পেতে পারি ওর মাধ্যমে৷  ”  আত্মবিশ্বাসের সুর রফিক ভাইয়ের কন্ঠ ছাপিয়ে গেলো৷ 

লক-আপে আমরা একসাথেই ঢুকলাম৷  হারুন মামা দুই হাঁটুর মাঝে মুখ ডুবিয়ে বসে আছে৷  প্রবল হতাশা যে তাকে গ্রাস করে ফেলছে সেটা তার দেহের বাহ্যিক পরিবর্তন দেখেই বোঝা যাচ্ছে।  মানুষ দুশ্চিন্তায় শুকিয়ে যায়৷  হারুন মামার অবস্থাটাও তাই৷   

রফিক ভাই ওর নাম ধরে ডাকলেন৷  মুখ তুলে উপরে তাকালো সে৷ তারপর কিছুক্ষণ নিষ্পলক তাকিয়ে রইলো৷  আমায় আশা করেনি নিশ্চয়ই।  চেহারা থেকে নিস্পৃহ ভাবটা গেলো না সহজে৷  যেন জাগতিক সব আশা হারিয়ে গিয়েছে ওর জীবন থেকে৷  ওর জায়গায় নিজেকে কল্পনা করে খানিকটা সেরকমই মনে হলো আমার৷ 

জিজ্ঞেস করলাম “ মামা কেমন আছেন? ”প্রশ্নটা শেষ করেই মনে হলো ভুল যায়গায় ভুল প্রশ্ন করে ফেলেছি৷  এমন অবস্থায় কোন মানুষ অন্তত উত্তরে “  ভালো আছি ”   বাক্যটা উচ্চারণ করবে না৷       

হারুন মামার ঠোটের কোনা খানিকটা সম্প্রসারিত হতে গিয়েও থেমে গেলো৷  সৌজন্যের হাসিটা হাসার মতন অবস্থাও ওর নেই৷  রিমান্ডের নিয়মটা আমি জানিনা৷ তবে   ওর চেহারা দেখে মনে  হচ্ছে এক ধাপ টর্চার করা হয়েছে ওর ওপর৷ 

পরে রফিক ভাইয়ের কাছে জানতে হবে৷ 

হারুন মামা শুকনো মুখে আমায় জিজ্ঞেস করলেন “ মামা আফনে এইখানে? ”

আমি কৌতুকের সুরে বললাম “ আপনার হাতের চা খেতে এসেছি৷  আপনার ছেলে আপনার মতন চা বানাতে পারে না মামা৷  ”

এবার উনি সর্বোচ্চ চেষ্টা করে একটা ফিকে হাসি দিলেন৷  তারপর বিষাদমাখা কন্ঠে বললেন “ আমার হাতের চা আর আপনার খাওন হইবো না মামা৷ আর কোনদিনই না!” 

আমি কন্ঠে  খানিকটা উৎসাহ এনে বললাম “ কেন হবে না! আপনি আমাকে সাহায্য করলেই হবে?  করবেন তো? ”

“ আমি নিজেই মহা বিপদে আছি মামা।  আফনারে কেমনে সাহায্য করমু? ” অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলো চা ওয়ালা হারুন। 

“ আমাকে সত্য বলবেন৷  কোন কিছুই লুকাবেন না৷  আমি চাই আপনি এই বিপদ থেকে বের হয়ে আসুন৷ এই  পুলিশ ভাই কিন্তু আমার খুব কাছের বড়ভাই৷ আপনি সত্যি বললে উনি আপনাকে উদ্ধারের একটা ব্যাবস্থা করতে পারবেন৷  ”

আমার কথা যে হারুন মামা বিন্দুমাত্র বিশ্বাস করতে  পারছেন না সেটা উনার চাহনিতে স্পষ্ট বোঝা গেলো৷  তবে এটাও বুঝলাম যে উনি সামান্য কিছু হলেও আড়াল করেছেন৷  সেটা বুঝতে পেরে আমি রফিক ভাইকে একটু বাইরে যেতে বললাম৷ 

যেমনটা ভেবেছিলাম৷  হারুন মামা খানিকটা সহজ হয়ে এলেন৷  তারপর ঝরঝর করে কেঁদে ফেললেম বাচ্চাদের মতন করে৷  “ বেশি লোভ করন ভালা না   মামা৷  এই লোভেই আমারে খাইছে!  ”

কি হয়েছে খুলে বলুন তো মামা। 

“ চায়ের ব্যাবসা খুব ভালাই চলতাছিলো মামা৷  আশেপাশের অন্য দুকানেও চা বিক্রি অইতাছিলো ভালা।  আমরা ফুলের চা বিক্রি করা শুরু করছিলাম আপনাগো মোবাইলে যে ছবিগুলান আহে সেইগুলার চাহিদা দেইখা৷  ”

বুঝলাম সোশাল মিডিয়ার কথা বলতে চাইছে৷ 

তারপর? ” 

“ একদিন সইন্ধাবেলার কতা৷  আপনাগো মতনই ইস্মার্ট কইরা দেখতে এক ছেলে আইলো দোকানে৷  ফুলের চা অর্ডার করলো।  যাওয়ার সময় জিজ্ঞাস করলো ব্যাবসাপাতি কেমন চলে৷  কইলাম মোটামুটি চলে মামা৷  এইডা শুইনা সে কইলো মোটামুটি কইলে চলবো?  ব্যাবসা বাড়াইতে হইবো৷  এই ফুলের চায়ের লগে একটা জিনিস মিশাইলেই চায়ের বিক্রি বাইড়া যাইবো।  আমি কতা শুইনা হাইসা দিলাম। 

চায়ের লগে কি মিশামু? 

  লুকটা  আমারে একটা হোমিপ্যাতির শিশির লাহান শিশি দিয়া কইলো এইডা ফুলের চা বানানির সময় মিশায় দিতে৷ শ্যাষ অইলে যেন তারে জানাই।  সে নিজেই আরো দিয়া যাইবো৷   কোন টেহা দিতে অইবো না৷   আমি ভাবলাম ফিরি জিনিস দিয়াই দেহি কি অয়।  মামা আফনে বিশ্বাস করবেন না৷  একদিন যাইতে না যাইতেই আমার বেচাবিক্রি সবগুলা দুকানের চাইতে বাইড়া গেলো।  জাদুর লাহান কারবার! ”

“ জিনিসটা দেখতে কেমন মামা? ” আমার প্রশ্নে তীব্র কৌতূহল। 

“ পরিস্কার তেলের লাহান৷ কিন্তু চায়ের পানির লগে সুন্দর কইরা মিইশ্যা যাইতো!  বুঝনের কুনো উপায় নাই৷ কুনো বাড়তি গন্দও নাই !  ”

“রিকশাওয়ালা বদরুলের আগে আপনার কাছে এরকম অভিযোগ আর কখনো এসেছে? মানে ওর মতন কারো পেটের সমস্যা হয়েছে? ”

আইছে মামা৷  আরো কয়েকজন আইছে।  কিন্তু সবাই খালি কইছে আমি ফুলের চায়ের কাপগুলান  ঠিকমতোন পরিস্কার করছি নাকি। আমার কাপের ময়লা খাইয়া নাকি তাগো প্যাট খারাপ হইছে৷  ”

“ ঐ লোকটা কোথায় থাকে জানেন  তো?  ”

“ না মামা৷  কুনোদিন জানা অয় নাই৷  সে শিশির তেল শেষ অইলে নিজেই আইতো নতুন শিশি লইয়া৷ আমার কুনোদিন  কইতে অয় নাই৷  ”

“ আপনার কথা অনুযায়ী ঘটনার মূল আসামী তাহলে আরেকজন।  কিন্তু আমি আপনার কথায় বিশ্বাস করলেও অন্য কেউ কেন বিশ্বাস করবে।  আপনি যার কথা বলছেন তার অস্তিত্ব প্রমাণ করাই তো সম্ভব না।  ”   

হারুন মামা হতাশভাবে  মাথা নাড়লেন।

আমার মনে কিন্তু বিশ্বাস জন্মেছে।  ক্রিমিনোলজি পড়ার সুবাদে অভিজ্ঞতার আলোকে   যতটা টের পেয়েছি মামা মিথ্যা বলছেন না।  কিন্তু এই অজ্ঞাত লোকটাকে খুঁজে বের করবো কিভাবে?  যে মামাকে লোভ দেখিয়ে ঐ বিশেষ তরলের শিশি দিয়ে যাচ্ছে? 

আমি তবুও যতটা পারা যায় হারুন মামাকে ভরসা দিয়ে সেখান থেকে চলে এলাম।   রফিক ভাইকে জিজ্ঞেস করলাম কেসের কার্যক্রম কতদূর? কবে নাগাদ কোর্টে উঠতে পারে?  ”

মুখ দিয়ে চুকচুক করে আফসোস  জাতীয় একটা শব্দ করতে করতে ভাই বললেন “ খুব বেশি হলে এক সপ্তাহ আটকানো যাবে ।  এটাকে একধরণের হত্যাই বলা যায়।  মৃত্যুশয্যায় দিয়ে যাওয়া জবানবন্দি খুব ভয়ানক।  ধরেই নেয়া হয় মৃত্যুর আগে কেউ মিথ্যা বলে না। একবার কোর্টে উঠলে আর আমার হাতে কিছুই থাকবে না।   ”

আমি ফোন নাম্বার অদলবদল করে আসতে আসতে অনুরোধ করলাম  নতুন কিছু জানতে পারলে আমায় যেন সেটা কষ্ট করে জানানো হয়। 

থানা থেকে বের হয়েই চায়ের তেষ্টাটা পেয়ে বসলো।  অথচ কিছুক্ষণ আগেই চা খেয়েছি। অদ্ভুত সাইকোলজি আমাদের।    আসলে সামনের রাস্তাতেই চায়ের স্টল। ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপ দেখলেই  মন চায় একবার প্রানভরে  চুমুক দিতে। 

দোকানে চায়ের অর্ডার দিয়ে বয়াম থেকে বিস্কিট বের করে চিবোতে চিবোতে ভাবছিলাম ঐ লোকটা আর তার সাপ্লাই করা তরলের শিশিটার কথা।  শিশির তরলটা আসলে কি?  যা খেলে বেছে বেছে নির্দিষ্ট  কিছু মানুষের সমস্যা হচ্ছে! 

হতে পারে লোকটা বিশেষ কোন শারীরিক সমস্যা আছে এমন মানুষদের  টার্গেট করছে।  তাতে ঐ বিশেষ তরল মিশ্রিত অপরাজিতা চা খেয়ে যারা সুস্থ তাদের কিছু না হলেও ওসব রোগীরা আক্রান্ত হচ্ছে সহজে। 

“ এত বেশি চা খেলে তো আলসার হবে ভায়া,  রফিক সাহেব কি বললেন শোনেননি?”

 কন্ঠটা অপরিচিত। চেহারাটাও। 

লোকটার চেহারায় কোথায় যেন একটা কাঠিন্য আর সারল্যের মেলবন্ধন রয়েছে।  খুব সহজে তার মনের অবস্থা বোঝা কঠিন হবে।  পরনে কালো শার্ট আর জিন্স।  বয়স আমাদের কাছাকাছি হবে। 

খানিকটা বিস্ময় নিয়েই  বললাম “ আপনিও কি থানায় কোন কাজে  গিয়েছিলেন? আমরা তো রুমের ভেতরে ছিলাম।  আপনি শুনলেন কিভাবে?  ”

“ ধরে নিন তাই।  থানায় শুধু আপনার কাজ থাকবে তা তো নয়। আপনাদের জন্য কষ্ট হচ্ছে।  হারুন মামার ফুলের চা আর খাওয়া হবে না    ” হাসিমুখে জবাব দিলো সে। 

“ হারুন মামাকে চেনেন আপনি?  নিয়মিত যেতেন তার দোকানে?  ”

“ অনিয়মিতভাবে নিয়মিত।  ” কেমন একটা কৌতুক খেলা করে গেলো তার চোখে। 

“ ঠিক বুঝলাম না।  ”

“ বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া যেতাম না।  আমার সন্তানদের নিয়ে যেতাম আর মাঝেমধ্যে চা খেতাম। তারপর ওদের রেখে চলে আসতাম।   ”

”ও ”।  মনে মনে ভাবলাম আশেপাশের কোন স্কুলে উনার সন্তানরা পড়ে নিশ্চয়ই।  দেখে অবশ্য বিবাহিত বলেই মনে হচ্ছিলো না।   

আমি আরো কথা বাড়াবো কি না ভাবছি ।  তখন উনিই জিজ্ঞেস করলেন “ হারুনের কি ফাঁসি হবে?  নাকি যাবজ্জীবন?  ” কেমন যেন একটা আশাবাদ তার কন্ঠে।  যেন হারুনের একটা  কিছু হোক সেটা উনি খুব করে চাইছেন।

আমি বললাম “ এখনো কিছু বলা যাচ্ছে না।  এই কাজে শুধু সে একাই যুক্ত না।  আরেকজন আছে। চোরের মতন এসেছিলো মামার কাছে।  এখন চোরের মতনই পালিয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছে। 

“ সে মোটেই পালিয়ে বেড়াচ্ছে না। ” আকস্মিকভাবে তার কন্ঠের তেজ যেন বেড়ে গেলো।  যেন কথাটা তাকে উদ্দেশ্য করে বলেছি আমি। 

“আপনি চেনেন তাকে?  ”

“ নিজেকে চেনাটা পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিন কাজের মধ্যে একটা।  তবে হ্যাঁ।  আমি নিজেকে চিনি।  ”

আমার শরীরটা কেমন একটা ঝাঁকুনি দিয়ে উঠলো। লোকটা নিজে থেকে ধরা দিতে এসেছে নাকি নিছক মজা করছে?

বললাম “ ভূমিকায় যাচ্ছি না।  আপনিই যদি সেই লোক হন তবে অসহায় মানুষদের সাথে  এরকম শত্রুতা  কেন করছেন?  তারা   আপনার কি ক্ষতি করেছে?  ”

এদিকে আমার একটা হাত পকেট থেকে মোবাইল বের করে রফিক ভাইকে মেসেজ দেয়ার কাজটা সেরে ফেলেছে। 

তাতে লেখা

“ থানার সামনের চায়ের দোকানে আসুন। লোকটার খোঁজ পাওয়া গেছে।  ”

পুরো ব্যাপারটা লোকটার চোখের অগোচরে ঘটলেও লোকটা আমার দিকে তাকিয়ে  একবার শান্তভাবে হাসলেন।। তারপর বললেন “ লাভ নেই।  আপাতত সমস্ত জাগতিক যোগাযোগের বাইরে অবস্থান করছেন আপনি। একটা সম্পূর্ণ নতুন বলয়ে।    ”

“ তারমানে?  ” চমকে উঠলাম আমি। 

“ আপনার সাথে খেজুরে আলাপ করার জন্য যে আমি আসিনি সেটা তো আপনার বোঝার কথা।  আপনারা এত  ঘোড়েল কেন বলুন তো?  ” 

“ আপনি যেভাবে “  আপনারা ” শব্দটা উচ্চারণ করছেন সেটা শুনে মনে হচ্ছে আপনি মানুষের জাত না।   ফেরেশতা।  ” তাচ্ছিল্যের সুরে বললাম আমি।  ইতিমধ্যে আমার মোবাইল স্ক্রিনে ভেসে উঠেছে “ মেসেজ নট সেন্ট! ”

কাকতালীয় ব্যাপার মানুষের সাথে হলে মানা যায়।  তাই বলে যন্ত্রের সাথে তার কি সম্পর্ক! হয়তো ব্যালেন্স শেষ হয়ে গিয়েছে ফোনের।   নইলে লোকটা বললো  আর সত্যি সত্যি আমার জাগতিক সব যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গেলো এটা বিশ্বাস করা আমার জন্য শক্ত। 

ব্যালেন্স চেক করে দ্বিতীয় ধাক্কাটা খেলাম। ব্যালেন্স আছে পর্যাপ্ত।  কিন্তু ধীরে ধীরে ফোনের দুটো সিমের নেটওয়ার্কের খুঁটি কমতে কমতে  হারিয়ে যাচ্ছে। 

দ্বিতীয় ধাক্কাটা ছিলো ছোটখাটো।  টেকনিক্যাল প্রব্লেম ধরে নিলে ব্যাপারটা স্বাভাবিক।  কিন্তু এইমাত্র যা ঘটলো তার ব্যাখ্যা আমি কিভাবে দেবো? আমার আশেপাশে যতদূর চোখ যায় কোন জনমানব নেই।  একটা কুকুর বা বেড়ালও চোখে পড়ছে না।  হঠাৎ ঝড়ের পূর্বাভাস শুনে যেমন সবাই তড়িঘড়ি পালায় তেমন পালিয়েছে।  কোলাহলে ভরপুর রাস্তায় হঠাৎ শুনশান   নীরবতা নেমে এলে মনে হয় আসন্ন বিপদের সব রাস্তা যেন খুলে গেলো!  এক্ষুনি আধার নামবে! 

খানিক চারপাশ দেখে নিয়ে আমি অনেকটা ভয় পাওয়া গলাতেই বললাম “ আপনার ম্যাজিক দেখানো শেষ হয়ে থাকলে  দয়া করে এসব বন্ধ করুন।   আমি যথেষ্ট মুগ্ধ হয়েছি!  ” 

আমার আশেপাশে একটা গমগমে আওয়াজের আবির্ভাব হলো। শব্দটার সঠিক উৎপত্তিস্থল আমি বলতে পারবো না।  যেন আশেপাশে যত জড়বস্তু আছে শব্দগুলো সেগুলোর ভেতর থেকে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে! পরিচিত কন্ঠস্বর। 

“ আমি জানি আপনার মনে হাজার প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। হতাশ হবেন না।  সব জানাতেই এসেছি আমি।  আপনার কথা অনুযায়ী আমরা ফেরেশতা নই এটা সত্য।  কিন্তু মানুষও যে নই সেটা টের পেয়েছেন বোধ করি।  ”

“ তাহলে কে আপনারা?  অতিপ্রাকৃত কিছু?  ”

“ মানুষের একটা বড় ভুল কি জানেন?  যা চোখে দেখতে পারে না তাকেই অলৌকিক বস্তু হিসেবে ধরে নেয়। ভাগ্যিস অণুবীক্ষণযন্ত্র আবিস্কার হয়েছিলো।  নইলে ব্যাকটেরিয়া বা ভাইরাসকেও আপনারা নিছক ভূতের কারসাজি মনে করতেন।    আপনার কি মনে হয় যিনি এই বিশাল পৃথিবীর স্রষ্টা তিনি শুধু মানুষ আর কতিপয় পশুপাখি সৃষ্টি করেই থেমে আছেন? যার জ্ঞান আর ক্ষমতা অসীম তিনি চাইলেই অনেককিছু করতে পারেন যা মানুষের ক্ষুদ্র জ্ঞানে কুলোবে না।  ”

“ ধরে নিলাম আমরা ক্ষুদ্র জ্ঞানের অধিকারী।  আপনি যে সত্ত্বাই হোন না কেন অসহায়  মানুষকে সাক্ষাৎ মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়ে কি মহাজ্ঞানীর কাজটা করছেন? ” আমার কন্ঠে প্রবল ঘৃনা। 

“ আবারো সেই ক্ষুদ্র জ্ঞানের পরিচয় পাচ্ছি।  আপনাদের আশেপাশের সব ঘটনার খোঁজ আপনারা নেন? ”

রিকশাওয়ালা বদরুলকে কেন মারতে হলো সেটা জানলে ওর মৃত্যুটা আর দুঃখজনক মনে হবে না আপনার।  ”

“ ওকে আপনি মেরেছেন?  ”

“ ঠিক আমি নই। আমার সন্তানেরা। আমি শুধু  ওদেরকে হারুনের চায়ের দোকানে রেখে এসেছি।  হারুন ওদের বদরুল পর্যন্ত পৌঁছে দিয়েছে।    ”

“ হারুন মামা নিজে পৌঁছে দিয়েছে? ”

“ যদি খুব সহজ করে বলতে চাই হারুনকে শুধু  অপরাজিতা ফুলের চা বানাতে হয়েছে।  আর তাতে মেশাতে হয়েছে আমার সন্তানদের!  ”

“ কিসব আবোলতাবোল বলছেন?  ”

“ আবোলতাবোল নয়।  আপনি প্যারাসাইট বা   পরজীবির কথা শুনেছেন কখনো?  জীবন্ত কোনো সত্ত্বার ওপর বেড়ে ওঠা আরেকটি জীবন। সেটা উদ্ভিদ হোক বা প্রাণী। ”

“ আপনি বলতে চাইছেন আপনার সন্তানেরা আসলে পরজীবি?  বদরুলের পেটের টিউমার  তারাই বাঁধিয়েছে?  ”

“ যদি বলি অনেকটা তাই।  তবে পুরোটা নয়।  ওরা শুধু ওদের বিকশিত হবার পথ খুঁজে পেয়েছে।  এই যা!  বদরুলের দেহ ছিলো ওদের বিকশিত হবার দারুণ একটা মাধ্যম ।  ” 

“ তারজন্য একজন জলজ্যান্ত মানুষকে মেরে ফেলতে হবে?”

“ আমরা সৃষ্টির শুরু থেকেই আপনাদের সাথে বসবাস করে আসছি।  আমাদের বিকাশের নানা পথের মধ্যে নিম্ন রুচির মানুষকে বিকাশের মাধ্যম বানানোটা অন্যতম।  মানুষের মতন আমাদের আমাদের নির্দিষ্ট কোন আকার বা অবয়ব নেই।  আমরা বিকটাকার সাপ,  আগুনমুখো ড্রাগন বা অন্য যেকোন হিংস্র শ্বাপদে রুপ নিতে পারি।    আমরা আচমকা সৃষ্ট হতে পারি অথবা কোন মাধ্যমের উপস্থিতিতে।  যখনি পৃথিবীতে আপনাদের অপরাধের ফলে প্রকৃতির ওপর ধ্বংসযজ্ঞ নেমে এসেছে আমরা প্রতিরোধ হিসেবে কখনো ভাইরাস আর কখনো প্রলয় হিসেবে তাদের বধ করেছি।  বিশ্বাস করুন দুর্বৃত্তের পেট চিড়ে বের হয়ে আসাটা আমাদের সবচাইতে গর্বের কাজগুলোর মধ্যে একটা!  ”

“ এরজন্য অপরাজিতা চা কে বেছে নিয়েছেন আপনারা? ”

“ অপরাজিতা চা তো এখানে মূখ্য নয়। যেসব খাদ্য বা পানীয় পাবার উন্মাদনা মানুষের মধ্যে খুব তাড়াতাড়ি  তৈরি হয় সেগুলোকেই আমরা বেছে নিই।  অপরাজিতা চা খেতে খুব আহামরি সুস্বাদু নয়।  কিন্তু সোশাল মিডিয়ায় প্রদর্শনের লোভে হলেও অনেক মানুষ এর দিকে ছুটে এসেছে।  ভালোদের কিছু হয়নি।  খারাপরা শাস্তি পেয়েছে।     তবে একটা ব্যাপার জানিয়ে রাখা ভালো   অমৃত বা এলিক্সার অব লাইফের রংও কিন্তু আপনাদের এই চায়ের রংয়ের মতন। ”

“ বদরুল কি অপরাধ  করেছিলো?  ” নিজের শান্ত কন্ঠ শুনে নিজেই অবাক হলাম আমি।  ”

“ ও নিজের গ্রামে দুই বংশের মধ্যে ঝামেলা থাকার জের ধরে একটা খুন করে পালিয়ে আসে। আপনার দুনিয়ার আইন ওকে ধরতে পারেনি।   যদিও ওকে  মানুষ না বলে অমানুষ বলাটাই শ্রেয়।”

“ ওর মতন ছা-পোষা মানুষের এত বড় স্পর্ধা?  ”

“ আপনাদের সংকীর্ণ মনের আরেকটা উদাহরণ দিচ্ছি জনাব।  সৃষ্টির শুরু থেকে মানুষদের দেখে এসেছি আমরা।  আপনারা সচরাচর বলে থাকেন বাবা-মারা কখনো খারাপ হন না,  ভাই-বোনরা কখনো খারাপ হয় না,  আত্মীয়রা খারাপ হন না,  শিক্ষকদের মতন মহৎ কেউ হয় না

সম্পর্ক আর পেশার গুণে সবাইকে এমন একটা আসনে বসান  আপনারা  যেটা থেকে পরে আর তাদের নামানো যায় না।  ঘৃণ্য অপরাধ করলেও না।

কিন্তু কঠিন সত্যটা হলো মানুষের বৈশিষ্ট্য একটাই।  হয় সে পরিস্থিতিতে পড়ে পশুতে পরিণত হবে নয়তো প্রবৃত্তিকে দমন করে মানুষে।  সম্পর্ক বা পেশার গুনে তাদের বিচার করাটা চূড়ান্ত বোকামি।  ”

“ সব নাহয় মেনে নিলাম কিন্তু হারুন মামা কে যে এখন ফাঁসিতে ঝুলতে হবে নইলে জেলে পঁচতে হবে।  এটার দায়ভার কার?  ”   

“ লোভের দায়ভার  লোভীর নিজের।  হারুন তার লোভের পরিণাম ভোগ করছে।  ওর কাছে অভিযোগ এসেছিলো আমার শিশির তরল মিশ্রিত চায়ের ব্যাপারে।  বাড়তি টাকার লোভে সে সেটা এড়িয়ে গেছে। ”

আমি এসব শুনে ভাবছিলাম আমার নিজের জীবনে কোনো বড় অপরাধ থেকে থাকলে এই পরজীবিরা আমাকে ও ছেড়ে দেবে না নিশ্চয়ই।  একটু মাথা খাটাতেই মনে পড়ে গেলো।  সোশাল মিডিয়া আজকাল সহজলভ্য। আমার একটা বন্ধু ছিল খুবই লাজুক প্রকৃতির।  ওকে নিয়ে আমরা খুব বাজেভাবে হাসি-তামাশা করতাম। এমনকি ও মন খারাপ করলেও ছাড়তাম না। সোশাল মিডিয়ায় ও  পোস্ট করলে সেখানেও ওকে নানারকম উল্টা-পাল্টা কথাবার্তা বলতাম। একসময় ও খুব ডিপ্রেসড হয়ে পড়ে এবং তার কয়েকদিনের মাথায় সুইসাইড করে। এ ঘটনায় নিজেকে মাঝে মাঝে দোষী মনে হয়। কিন্তু আজ সেই দোষ খুব বড় রকমের দোষ মনে হচ্ছে।

আমার সামনের লোকটি এগিয়ে আসলেন। তার হাতে একটা কাপ। আমাকে সেটি এগিয়ে দিয়ে বললেন এই নিন চা খান। আপনার জীবনের শেষ অপরাজিতা চা!! আমি চিৎকার করতে চাইছিলাম কিন্তু মুখ দিয়ে কোন শব্দ বেরোল না। চারদিক অন্ধকার হয়ে এল!!!