Loading...

রেয়ন

Support Us or Donate Some Love for Us



জুন ২০২১

প্রফেসর কিয়ারা রিক বেশ সঙ্গিন অবয়বে বসে আছেন।যতটা না বিস্মিত তার চেয়েও অনেক বেশি চিন্তিত। আর তার ঠিক সামনেই বসে আছে ১৪ বছর বয়সী বাংলাদেশি কিশোর রিয়ন। সে বেশ মনোযোগ দিয়ে দ্যা টাইম মেশিন বইটি পড়ছে।এই ছেলেটিকেই গত দুই দিন ধরে নিরীক্ষা  করছেন ড. কিয়ারা রিক। তার সাথে সাথে বিভিন্ন পরীক্ষাও চলছে। শুধু তিনি নন আরো অনেকেই সংসৃষ্ট আছেন। কিন্তু কোনো সমাধানে আসতে পারছেন না কেউই। বড়ই অদ্ভুত এক গল্প বলছে ছেলেটি৷ কয়েক সপ্তাহ পূর্বে ছেলেটির পরিবারের সবাই কোভিড ১৯  ভাইরাস এ আক্রান্ত হয় তাই ছেলেটিকেও আইসোলেশনে রাখা হয়। কাকতালীয়ভাবে বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার জন্য সে নিজে তার দেহে ভাইরাস নিতে রাজি হয় এবং পরবর্তীতে তার মধ্যে ভাইরাস প্রবেশ করানো হলে খুব কম সময়ের মধ্যে তা নিজে নিজেই নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়। বিষয়টি প্রথমে গোপন রাখা হলেও ততক্ষণে আমেরিকায় গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআই এর কর্ণগোচর হয়ে গিয়েছিল। এরপর রিয়নকে বাংলাদেশ থেকে একপ্রকার জোরপূর্বক আমেরিকাতে নিয়ে আসা হয়, তাও অবশ্য চারদিন হয়ে গিয়েছে। গত দুই দিনে ছেলেটির মধ্যে প্রায় ১৭ বার কোভিড ১৯ এর ভাইরাস প্রবেশ করানো হয়েছে কিন্তু কোনোবারই তা ৭ সেকেন্ডের বেশি স্থায়ী হতে পারেনি। ছেলেটিকে বারবার টেস্ট করা হয়েছে কিন্তু এখনো পর্যন্ত বিশেষ কোনো বৈসাদৃশ্য পাওয়া যায় নি যার মাধ্যমে কোনো সমাধানের পথে এগিয়ে যাওয়া যেতো পারে। চীন, রাশিয়া, জাপান, ফ্রান্স, সিঙ্গাপুর সহ আরো অনেক দেশ ছেলেটিকে নিয়ে গবেষণা করতে চাচ্ছে কিন্তু আমেরিকা ছেলেটিকে হাতছাড়া করতে রাজি নয়। অন্যান্য দেশও বুঝতে পেরেছে সোজা আঙ্গুলে ঘি উঠবে না তাই আঙ্গুল বাঁকানোর চেষ্টা চলছে। তাই ছেলেটিকে রাখা হয়েছে এক গুপ্ত ল্যাবরেটরীতে। অনেকক্ষণ অন্যমনষ্ক থাকার পর ড.রিক আবার ছেলেটির দিকে মনোযোগ ফিরালেন। না, তার কাছে ছেলেটিকে খুব একটা চিন্তিত মনে হচ্ছে না।

অবশ্য গত দুইদিনে তার কাছে কখনোই ছেলেটিকে চিন্তিত মনে হয় নি।

– রেয়ন, আমি কি তোমাকে বিরক্ত করতে পারি?

-আমার নাম রেয়ন নয়, রিয়ন। আর আমি বিরক্তবোধ করব না। আপনি কথা বলতে পারেন।

– ওহ দুঃখিত। আমার ভুল। যাইহোক তোমার কি মনে হয় এর সমাধান কি হতে পারে? 

– যা কিছু হতে পারে।এখানো অনেককিছুই অস্পষ্ট।

– তুমি কি বলতে চাও এটি একটি অতিপ্রাকৃত ঘটনা?

– ধরে নিতে পারেন। আবার কাকতালীয়ও হতে পারে।

_____

– স্যার কয়েকটি পরীক্ষার ফলাফল পেয়েছি আর আমার মনে হচ্ছে আমরা কিছু একটা পেয়েছি আপনি দয়া করে একটু দেখবেন?

– হ্যা এতেয়ানো দেখি কি পেয়েছ।ইনক্রিডেবল। ইনক্রিডেবল ছাড়া কিছুই নয়। আমি বুঝতে পারছি না এই বিষয়টা আগে চোখে পরে নি কেন?

– আমিও সেটা বুঝতে পারছি না স্যার।

– ড.রিক আর এতেয়ানো তোমাদের এক্ষুনি এখান থেকে আমার সাথে চলে যেতে হবে।

– কিন্তু মি. ফ্রাঙ্ক আমরা এমন কিছু জানতে পেরেছি যা শুনলে তুমি……..

– না এখন কিছুই শুনতে পারব না। একদম সময় নেই। আমাদের এই গুপ্ত ল্যাব সম্পর্কে কোনো এক ইন্টেলিজেন্সি টিম খোঁজ পেয়েছে। তারা আক্রমন করতো পারে।

– তারা কারা? 

– সঠিক জানা নেই।সম্ভবত রাশিয়ান বা চীনা হতে পারে।

(গোলাগুলি শুরু হয়েছে)

– যেটার আশঙ্কা করছিলাম তাই হলো। ড.রিক আপনি শীঘ্রই ছেলেটিকে নিয়ে এক্সিট পয়েন্ট এ আসুন আমি আর এতেয়ানো সেখানেই থাকব।

– ঠিক আছে।

– রেয়ন চলো আমার সাথে।

– কোথায় আর এত গোলাগুলি হচ্ছে কেন? 

– পরে বলছি এখন চলো।

– হ্যা চলুন।

– ওহ সিট ( ড.রিক গুলিবিদ্ধ হয়েছেন) 

– আমার কাঁধে হাত রেখে চলুন।

– হ্যা গাড়িতে উঠতে হবে আমাদের।

– মি. ফ্রাঙ্ক আমার হাতে গুলি লেগেছে।

– হ্যা তা তো দেখতেই পাচ্ছি অনেক রক্তক্ষরণও হচ্ছে বলে মনে হচ্ছে তবে এখন চিন্তার কোনো কারণ নেই গাড়িতে উঠে পড়েছি শীঘ্রই নিরাপদ স্থানে পৌছে যাব।

– অবশ্যই।

_______

– অবশেষে আমরা নিরাপদ ড. রিক। আর তোমার গুলিও তো বের করে নেওয়া হয়েছে। তোমাকে ভাগ্যবান বলা যেতে পারে ৫.৬ এমএম এর গুলি, হাতে না লেগে বুকে কিংবা পিটে লাগলেও বিপদ ছিল।

– তা বলতে পারেন। যাইহোক এতেয়ানো তুমি আগের নমুনাগুলো আবার পরীক্ষা করার ব্যবস্থা করো আর আমি একটু ছেলেটির সাথে কথা বলতে চাই।

– ঠিক আছে স্যার।

________

– কেমন আছো রেয়ন ওহ সরি রিয়ন?

– ভালো আপনি?

– এখন খুব একটা খারাপ বলা যাচ্ছে না।

– আপনি কি শুরু থেকেই এমন সাহসী? 

– আমি সাহসী নই। খুব ভীতু।

– আপনি জানতেন আমাকে নিয়ে গবেষণা করলে এমন বিপদের সম্মুখীন হতে পারেন তবুও আপনি তা করেছেন।

– এটা আমার দায়িত্ব ছিল।

– আপনার পরিবারে কে কে আছেন?

– আমার পরিবার বলতে স্ত্রী আছে আর একটা মেয়ে ছিল।

– ছিল বলতে কি? 

– ছিল বলতে সে আর নেই। মারা গিয়েছে।

– কি হয়েছিল তার?

– করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছিল সে।

– যখন সে মারা যায় তখন আপনি কোথায় ছিলেন? 

– আমি তখন সিঙ্গাপুর ছিলাম।  গবেষণার কাজে৷

– ডাকা হয়েছিল আপনাকে? 

– না নিজের ইচ্ছায় গিয়েছিলাম।

– দেখতে পারতেন না সেজন্য? 

– হ্যা। বলেছিলাম না আমি খুব ভীতু।

– স্যার টেস্ট গুলো শেষ আর ফলাফল একই।

– ঠিক আছে তুমি যাও এতেয়ানো পরবর্তী কাজগুলো শেষ করো।

– আপনাকে দেখে মনে হচ্ছে আমার সম্বন্ধে কিছু জানতে পেরেছেন।

– হ্যা তবে কিছু নয় বিশেষ কিছু।

– তো আমিও একটু জানি আমার সম্পর্কে নাকি?

– অবশ্যই। তোমার সে অধিকার আছে। তুমি হয়তো জানো মানবদেহে ক্রোমোজোম সংখ্যা ২৩ জোড়া।

– তা অবশ্য জানি ।

– কিন্তু তোমার ক্ষেত্রে ভিন্ন। তোমার দেহে ক্রোমোজোম সংখ্যা ২৫ জোড়া এখানে ২২ জোড়া অটোজোম আর ১ জোড়া সেক্স ক্রোমোজোম সবই ঠিক কিন্তু বাকি যে ২ জোড়া ক্রোমোজোম আছে তা আশ্চর্যজনক হারে শ্বেতরক্তকণিকা তৈরি করছে আর এন্টিবডি তৈরি করছে। যার ফলেই তুমি এই বিস্ময়কর রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা পাচ্ছ। যার কাছে কোভিড ১৯ কিছুই না। তোমার এন্টিবডি ভাইরাসকে সাত সেকেন্ডেই নিশ্চিহ্ন করে দিচ্ছে! যা সবার কাছে মনে হচ্ছে অতি প্রাকৃতিক। বুঝতে পারছ আমার কথা? 

– আমার কাছে সবকিছুই অবিশ্বাস্য লাগছে। তাহলে এখন আপনারা কি করতে চাইছেন? 

– করতে চাইছি নয় বলো কি করছি।কারণ তোমার ২৫ জোড়া ক্রোমোজোম বিশিষ্ট টিস্যু এখন প্রক্রিয়াকরণ চলছে। খুব শীঘ্রই তা হয়ে যাবে বলে আশা করছি।

– এরপর? 

– এর পর আর কি করোনা আক্রান্ত ব্যক্তিকে ইনজেক্ট করা হবে তোমার টিস্যু দিয়ে তৈরি প্রতিষেধক।

– সত্যিই সবকিছুই অবিশ্বাস্য।

– স্যার প্রক্রিয়াকরণ শেষ। প্রতিষেধক প্রস্তুত৷ আর মি. ফ্রাঙ্ক মারকো নামে একজন করোনা আক্রান্তকে নিয়ে ল্যাবে আসছেন। মারকো পরীক্ষার জন্য রাজি হয়েছে।

– ঠিক আছে তুমি ব্যবস্থা করো। আর রেয়ন চলো চলো আমরাও যাই মারকো এর জন্য অপেক্ষা করি।

– চলুন।

_________

– তুমি কি প্রস্তুত মারকো? 

– হ্যা আমি প্রস্তুত।

– তোমাকে ইনজেক্ট করা হয়েছে দেখা যাক এখন কি হয়।

সাত সেকেন্ডে সম্ভব হয়নি কিন্তু ১৪ মিনিট ৫৬ সেকেন্ডে মারকো এর দেহ থেকে করোনা ভাইরাস পুরোপুরিভাবে নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছে৷ আশা করা যায় অল্প কিছুদিনের মধ্যে পৃথিবী থেকেও নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। পৃথিবী আবার স্বাভাবিক হয়ে উঠবে৷

– সো ইয়াং ম্যান এই প্রতিষেধকের তো নাম দেওয়া উচিত, কি নাম দেওয়া যায়?

– এই প্রতিষেধকের নাম রেয়ন।রিয়ন নয়।

ড. রিক এখন খুব ব্যস্ত। তার কাছে খুব বেশি হলে তিন সপ্তাহ সময় আছে৷ ছেলেটির ক্রোমোজোম এর থেকে প্রতিষেধক তৈরি হয়েছে ঠিকই কিন্তু ছেলেটি এখন বিশেষ ধরণের লিউকোমিয়ায় আক্রান্ত তবে এটা সাধারণ লিউকোমিয়ার মতো নয়। সাধারণ লিউকোমিয়ায় শ্বেতকণিকা থাকে অকার্যকর কিন্তু রিয়নের ক্ষেত্রে কার্যকর তবে এটি একটি স্লো পয়জনিং সৃষ্টি করেছে যার কোনো প্রতিকার এখনো পাওয়া যায়নি। তাই ছেলেটি যে অচিরেই মারা যাচ্ছে এটা সবাই বুঝতে পারছে।গতকালকেই ড. রিক রিয়নকে এ সম্পর্কে বলেছে তবুও তার মনে হয়েছে ছেলেটি নির্বিকার। সে ভাবলেশহীনভাবে জানিয়েছে তারা যেন তাদের কাজ করে যায়।এমনিতে  ড. রিক কাউকে বেশিদিন মনে রাখে না তবে এই ছেলেটিকে তার অনেকদিন মনে থাকবে