Loading...

স্পাইঅক্টো

Support Us or Donate Some Love for Us



এক

গোধূলির আলো-আঁধারি সময়টা। পিকনিক শেষে সবাই মিলে ঘুরতে বেরিয়েছি। জায়গাটা বেশ সুন্দর। সুবিশাল সবুজ প্রান্তরের দুই ধারে ঘন জঙ্গল। সেখান থেকে পাখির কিচিরমিচির ডাকাডাকি এখনো শোনা যাচ্ছে। অন্য পাশে রঙবেরঙের ফুলের ছোট্ট বাগান। আরেক পাশে পায়ে হাঁটা সরু রাস্তা। রাস্তার ওপারে একটি ছোট্ট লেক।

আমি,সুমন ভাইয়া আর আমাদের চাচাতো ভাইবোন আরিফ ভাইয়া,আশিক ভাইয়া ও রেবা পিকনিকে এসেছি। আরিফ ভাইয়া আমাদের সবার বড়। ইঞ্জিনিয়ারিং ফার্স্ট ইয়ারে পড়ে। তার পরে সুমন ও আশিক ভাইয়া। কলেজে পড়ে। সবার ছোট আমি ও রেবা। মাত্র ক্লাস নাইনে পড়ি।

সবাই লেকের ধারে দাঁড়িয়ে সূর্যাস্ত দেখছি। অস্তগামী সূর্যের প্রতিবিম্ব লেকের পানিতে ঝলমল করছে। এমন সময় সুমন ভাইয়া প্রায় চিৎকার করে বলে উঠল,”ইশ্! গুহাটাতো দেখা হলো না!”

“আরে তাইতো! যেই গুহা দেখার জন্য় এতদূরে পিকনিক করতে এলাম সেটার কথাইতো সবাই ভুলে বসে আছি। সবাই একসঙ্গে বলে উঠলাম,চলো চলো তাড়াতাড়ি চলো!”

আমরা কেউই আগে কখনো গুহা দেখিনি। তাই সবার মনে এক ধরনের উত্তেজনা কাজ করছিল। কিন্তু আমরা কেউই বুঝতে পারিনি যে আমাদের জীবনের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ঘটনার শুরুটা হবে এই গুহা থেকেই।

দুই

যখন আমরা গুহার সামনে এসে পৌঁছলাম তখন সন্ধ্যা হয়ে গেছে। চাঁদ তখনো ওঠেনি। চারিদিকে আবছা আবছা অন্ধকার। সেই সঙ্গে মৃদু শীতল বাতাস বইছে। কিন্তু সেই আবছা অন্ধকারে মোবাইলের টর্চের আলোতে যখন দেখতে পেলাম গুহার মুখটা ছোটবড় অসংখ্য পাথর দিয়ে বন্ধ, তখন আমরা একেকজন রেগে আগুন হয়ে গেলাম। বিশেষ করে সুমন ভাইয়া তো আরও বেশি। গুহা দেখার জন্য়  ওর আগ্রহই ছিল সবচেয়ে বেশি। তাছাড়া গুহা দেখতে এখানে আসার আইডিয়াটাও ওরই ছিল।

ভাইয়া রেগে গিয়ে গুহার মুখের পাথরগুলোতে লাথি মারা শুরু করলো। ভাইয়ার দেখাদেখি আরিফ ভাইয়া ও আশিক ভাইয়াও পাথরগুলোতে লাথি মারা শুরু করলো। বেশ কিছুক্ষণ লাথি মারার পর গুহার সামনে থেকে একটা পাথর পরে গেল আর সেখানে একটা ছোট ফোঁকর দেখা দিল। সেখান থেকে কী যেন একটা বের হয়ে আসতে দেখে ভাইয়ারা রীতিমতো একটু ভয় পেয়ে পেছনে সরে দাঁড়াল। সেটা কিছু দূর সামনে অগ্রসর হওয়ার পর চাঁদের আলোতে সবাই দেখতে পেলাম সেটা আসলে একটা মাকড়শা। এটা দেখে ভাইয়ার রাগ মনে হয় আরও বেড়ে গেল। কাছেই পুরনো একটা লোহার রড পড়ে ছিল। ভাইয়া সেই রডটা তুলে নিয়ে ওটাকে পেটাতে শুরু করল। তার দেখাদেখি আরিফ ভাইয়া, আশিক ভাইয়া আর রেবাও আশেপাশে পড়ে থাকা ডালপালা দিয়েই ওটাকে মারতে লাগল। আমি কিছু না পেয়ে ওটাকে পা দিয়ে লাথি মারতে লাগলাম। হঠাৎ কীসের যেন ঝটকা লেগে খুব জোড়ে চিৎকার দিয়ে পেছন দিকে ছিটকে পড়ে গেলাম আমি আর সুমন ভাইয়া। সারা শরীর ঝনঝনিয়ে উঠল। ওরা তাড়াতাড়ি এসে আমাদের দুজনকে কোনোভাবে দাঁড় করাল। ঠিকভাবে দাঁড়াতে পারছিলাম না বলে রেবা আমাকে আর আশিক ভাইয়া সুমন ভাইয়াকে শক্ত করে ধরে রাখল। আরিফ ভাইয়া জিজ্ঞেস করল,”কী হয়েছে এভাবে পড়ে গেলি কেন?”

সুমন ভাইয়া বলল,”জানি না। মনে হলো খুব জোরে ইলেক্ট্রিক শক খেয়েছি। সারা শরীর ঝনঝনিয়ে উঠল।”

আমি বললাম, “আমারও তাই মনে হচ্ছে। খুব দুর্বল লাগছে।”

ঠিক তখনই আশিক ভাইয়া ঐ মাকড়শার দিকে ইশারা করে প্রায় চিৎকার করে বলে উঠল,”সবাই দেখ ওখানে কী হচ্ছে!”

সবাই দেখতে পেলাম মাকড়শার নিথর দেহ থেকে ছোট ছোট বিদ্যুৎ স্ফুলিঙ্গ বের হচ্ছে। কেউ নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারলাম না।

রেবা গুহাটার দিকে ইশারা করে বলল,”ঐ গুহায় এরকম আরো থাকতে পারে”। তারপর ঐ ফোঁকরটার দিকে ইশারা করে বলল,”ঐ ফোঁকরটা তাড়াতাড়ি বন্ধ করতে হবে। নাহলে ওগুলো বেরিয়ে আসবে।”

আরিফ ভাইয়া তাড়াতাড়ি গিয়ে পাথর দিয়ে ফোঁকরটা বন্ধ করে দিল। ঠিক তখন আমার নজর পড়ল গুহার কাছে পড়ে থাকা একটা ছোট কালো বাক্সের মতো জিনিসের ওপর। আরিফ ভাইয়াকে ওটা দেখিয়ে বললাম,”ভাইয়া,দ্যাখো তো ওটা কী?”

ভাইয়া হাতে নিয়ে দেখল ওটা একটা ডায়েরি।

তিন

সবাই সুমন ভাইয়ার রুমে চুপচাপ বসে আছি। কারো মুখ দিয়ে কোনো কথা বের হচ্ছে না। অবশ্য একটু আগে ডায়েরিতে যা পড়লাম তা পড়ার পর কারোর মুখ দিয়ে কথা বের না হওয়াই স্বাভাবিক।

সংক্ষেপে বলতে গেলে,ডায়েরিটা ড.রফিকুজ্জামান নামে একজন বিজ্ঞানীর। তিনি ও তাঁর দল ঐ গুহার নিচে একটি গোপন ল্য়াবরেটরিতে একটি বিশেষ গবেষণা করেন। অমেরুদণ্ডী প্রাণীর মাঝে উন্নত স্তন্যপায়ী প্রাণীর বুদ্ধিমত্তা ছড়িয়ে দেয়ার বিষয়ে তাঁরা এক্সপেরিমেন্ট করেন। এতে তাঁরা সফলও হন। তাঁরা জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং ব্য়বহার করে ল্য়াবরেটরিতে এক বিশেষ ধরনের জীব তৈরি করেছেন যা স্থলে মাকড়শার মতো ও পানিতে অক্টোপাসের মতো চলাচল করে। এদের বুদ্ধিমত্তা প্রায় মানুষের সমান কিন্তু বিবেকহীন। তাঁরা এদের নাম দেন স্পাইঅক্টো। এদের তৈরি করার কিছুদিন পর এক দুর্ঘটনায় এরা খুব ভয়ঙ্করভাবে তড়িতাহত হয়। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় দুর্ঘটনায় এদের যতটা ক্ষতি হওয়ার কথা ছিল ততটা হয়নি। বরং দুর্ঘটনার পর এরা আরো শক্তিশালী হয়ে ওঠে। বিজ্ঞানী ড. রফিকুজ্জামান এদের ওপর বিভিন্ন গবেষণা করে জানতে পারেন যে, তড়িতাহত হওয়ার পর এদের জিনে বেশ বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটে। এদের ক্রোমোজোমে বিদ্যুৎ শক্তিকে রাসায়নিক শক্তিতে এবং রাসায়নিক শক্তিকে বিদ্যুৎ শক্তিতে রূপান্তরিত করতে পারে এমন এক বিশেষ জিনের আবির্ভাব হয়। যার ফলে এরা বাইরে থেকে পাওয়া বিদ্যুৎ ব্যবহার করে রাসায়নিক শক্তি এবং কোষে জমা থাকা রাসায়নিক শক্তি ব্য়বহার করে বিদ্যুৎ উৎপন্ন করার এক বিশেষ ক্ষমতা লাভ করে। এই ক্ষমতা ব্যবহার করে এরা অনেককে আহত করে। অবশেষে নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়লে বিজ্ঞানীরা এদের খাঁচায় আটকে রাখেন এবং মেরে ফেলার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু এর আগেই এরা খাঁচা থেকে পালিয়ে যায়। তবে সম্পূর্ণ গুহা ভেতর থেকে সিল করে রাখায় এরা গুহার বাইরে যেতে পারেনি। কিন্তু এরা সিল ভেঙে বাইরে যাওয়ার চেষ্টা চালাতে থাকে এবং ধীরে ধীরে সবাইকে মেরে ফেলতে শুরু করে। এদের মেরে ফেলার প্রক্রিয়া অত্য়ন্ত পরিকল্পিত ও নির্মম। বিজ্ঞানীরা এদের ধ্বংস করার অনেক চেষ্টা করেন কিন্তু প্রত্যেকবারই ব্যর্থ হন।

হঠাৎ আশিক ভাইয়া প্রায় চেঁচিয়ে বলে উঠল,”সবাই দ্য়াখো ডায়েরির শেষ পৃষ্ঠায় কী লেখা আছে!”

ডায়েরির শেষ পৃষ্ঠায় এক চাঞ্চল্য়কর তথ্য় লেখা আছে। কেউ কোনো স্পাইঅক্টোকে মেরে ফেললে এর বিশেষ ক্ষমতাটি ঐ ব্য়ক্তির মধ্য়ে এসে যাবে। এছাড়া ঐ পৃষ্ঠায় আরো লেখা আছে যে, বাইরে থেকে গুহাটি ধ্বংস করার সকল ব্য়বস্থা হয়ে গেছে। কীভাবে ধ্বংস করতে হবে সেটাও লেখা আছে। কিন্তু সেটা যে করা হয়নি তা আমরা সবাই জানি।

পৃষ্ঠাটি পড়া হয়ে গেলে সুমন ভাইয়া বলল,”আমি যাব। আমি গিয়ে ওই স্পাইঅক্টোদের ধ্বংস করব।”

এটা শুনে আরিফ ভাইয়া বলল,”তুই একা যাবি?”

“হ্য়াঁ,আমি একাই যাব। ক্ষমতাটা আমি পেয়েছি,তাই আমিই ওদের ধ্বংস করব।”

আমি বললাম,”ভাইয়া,আমিও তোমার সাথে যাব।”

“তুই যাবি আমার সাথে?”

“হ্য়াঁ,আমি যাব। আমিও ক্ষমতাটা পেয়েছি,তাই আমিও ওদের ধ্বংস করতে যাব।”

চার

পরিকল্পনা অনুযায়ী লেকের নিচের গোপন সুরঙ্গ দিয়ে আমি আর সুমন ভাইয়া জায়গাটিতে পৌঁছে গেলাম। রেবারা কানেক্টরের মাধ্য়মে আমাদের দিকনির্দেশনা দিচ্ছে। জায়গাটিতে এক বিশাল ট্রান্সমিটারের মতো যন্ত্র। নির্দেশনা অনুযায়ী সেটার লাল প্রান্তে ভাইয়া আর কালো প্রান্তে আমি শক্ত  করে ধরে বিদ্যুৎ প্রবাহিত করতে শুরু করি। সাথে সাথেই বিকট শব্দে পুরো জায়গা কেঁপে উঠে। বিস্ফোরণে পেছনে ছিটকে পড়ে যাই আমরা।

দেখতে পেলাম ভাইয়ার অক্সিজেন জারটা ফুঁটো হয়ে অক্সিজেন বেরিয়ে যাচ্ছে। টের পেলাম আমার অক্সিজেন টিউবটাও ফেটে গেছে। তাড়াতাড়ি এখান থেকে বেরোতে হবে। কিন্তু আমার সারা শরীর অবশ হয়ে গেছে,চেষ্টা করেও আর উঠতে পারলাম না। দেখলাম ভাইয়ারও একই অবস্থা।

চোখের সামনে সবকিছু ঝাপসা হয়ে আসছিল। খুব ইচ্ছে করছিল বাইরে গিয়ে পৃথিবীটাকে শেষবারের মতো একবার দেখতে। ভাইয়ারও হয়তো সেই ইচ্ছে হচ্ছিল। কিন্তু ইচ্ছেটা অপূর্ণই থেকে গেল।