Loading...

গ্রহাণুদের গল্প

Support Us or Donate Some Love for Us



“The Universe is under no obligation to make sense to you”- Neil deGrasse Tyson

আপনি যখন সৌরজগতের গ্রহগুলোর ডায়াগ্রামের দিকে নজর দেবেন, দেখবেন মঙ্গল আর বৃহস্পতি গ্রহের মাঝে এক বিরাট শূন্যস্থান। জার্মান বিজ্ঞানী বোড ইউরেনাস গ্রহ আবিষ্কারের ১০০ বছর আগে দেখেছিলেন যে, একটা গ্রহ থেকে তার পরেরটা কত দূরে থেকে সূর্যকে প্রদক্ষিণ করবে তার নিয়ম বাধা আছে। তিনি সেই নিয়মটা লিপিবদ্ধ করেন। কিন্তু সেই নিয়ম মতে মঙ্গল ও বৃহস্পতির ফাঁকটা অনেক বড়। এই গ্যাপ জ্যোতির্বিদদের মনে অশান্তি দিচ্ছিল৷ উনারা এই ফাঁকা জায়গাতে একটা গ্রহ দেখতে চেয়েছিলেন। ১লা জানুয়ারি, ১৮০১ সাল, তারা তাদের এই ইচ্ছা আংশিক ভাবে পূরণে সক্ষম হয়েছিলেন। ইতালীয় জ্যোতির্বিদ জুসেপ্পে পিয়াজ্জি আকাশে একটি আলোক বস্তু দেখতে পান, যার গতি ছিল আকাংখিত গ্রহটির জন্য একেবারেই নিখুত। কিন্তু তা দেখতে ছিল একটা সূক্ষ্ম বিন্দুমাত্র। তিনি প্রথমে এটাকে ধুমকেতু ধরে নেয় কিন্তু পরে জানা গেল যে, ওটা ধুমকেতুর নয়। আর এই নতুন বস্তুটিকে গ্রহ ধরে নাম দেওয়া হয় সিরিস। কিন্তু আদৌ-কী এটি কোনো গ্রহ ছিল?এই নিয়ে বিজ্ঞানীরা প্রথমে সংশয়ী ছিলেন। এর কিছু বছর পর সেই ফাঁকা জায়গায়, ১৮০২ এইরকম ২য় একটি বস্তুর আবির্ভাব ঘটে, তারপর ১৮০৪ সালে ৩য় ও ১৮০৭ সালে ৪র্থ একই জতের বস্তু দেখা যায়। এ থেকে উনারা নিশ্চিত হলেন যে এটি সৌরজগতের নতুন কোনো শ্রেণির বস্তু। যেহেতু এই বস্তুগুলো সেই সময়ের টেলিস্কোপে ছোট ছোট বিন্দুর মত দেখাতো আর খালি চোখে দেখতে পাওয়া তারাদের মত উজ্জ্বল ছিল, তাই এই নতুন বস্তুটির নাম দেওয়া হয় “অ্যাস্টারয়েডস”(Asteroids), যা গ্রীক শব্দ, এর অর্থ হল তারা-স্বরূপ (Star-like) বা তারা-আকৃতিক (Star-shaped)। আর বাংলার বলা হয় “গ্রহাণুপুঞ্জ”। 

২০ শতাব্দী শুরুর দিকে তারা আরো অনেক গুলো গ্রহাণুর সন্ধান পায় যার আজকের সংখ্যা বিলিয়ন হয়ে দাড়িয়। অনুমান করা হয় আমাদের সৌরজগতে ১ মিলিয়নের মত গ্রহাণু আছে যা ১ কি.মি. থেকে লম্বা আর এদের ব্যাসার্ধ ১০০ মিটার থেকে ১০০ কি.মি. হয়ে থাকে। 

কি এই গ্রহাণু? এটাকি খায় না মাথায় দেয়? এদের স্বাদ কেমন? দেখতে কেমন? ভর-ই বা কত?

আসলে কোনটা গ্রহাণু আর কোনটা গ্রহাণু নয় তার জন্য কোনো সংজ্ঞার ধরাবাঁধা নেই তবে, সাধারণত গ্রহাণু হল ছোট আকৃতির একধরনের বস্তু যা পাথর বা ধাতব পদার্থ দিয়ে তৈরি এবং এরা সূর্য কে প্রদক্ষিণ করে ঘোরে ও এদের সীমানা বৃহস্পতি গ্রহের কক্ষপথ পর্যন্ত বিদ্দমান। অবশ্য যেসব ছোট আকৃতির বস্তু বৃহস্পতির কক্ষপথের বাহিরে সূর্যকে প্রদক্ষিণ করে তাদের আলাদা সংজ্ঞা আছে। এ নিয়ে অন্য এক দিন গল্প করব নে। তা এগুলো খেয়ে দেখার ইচ্ছা আছে? সমস্যা নেই, গ্রহাণুরা নানান ফ্লেভারের হয়। যেমন : বেশিরভাগ অথ্যাৎ ৭৫ % গ্রহাণু কার্বন দিয়ে তৈরি, এরা হল সি-টাইপ (C-type) বা কার্বনেশাস। আবার ৬ ভাগের ১ ভাগ বা ১৭% গ্রহাণু সিলিকন বা দস্তার তৈরি এরা হল এস-টাইপ (S-type) বা সিলিকেশাস৷ আর বাকী ৮% হল এম-টাইপ (M-type) বা মিসসেলেনিয়াস এরা অন্যান্য মেটাল পদার্থের তৈরি তবে এদের মধ্যে লোহা ও নিকেলের আধিক্য বেশি। 

এদের আকারও বড় উদ্ভট। কেউ গোল, কেউ তে-কোণা, কেউ বা একেবারে লম্বা। বড় গ্রহাণু গুলো মোটামুটি গোলাকার, কিন্তু ছোট গুলো বেশি অনিয়মিত আকৃতির হয়। বিজ্ঞানীরা এদের আকার, এরা কতটুকু সূর্যের আলোর প্রতিফলন ঘটায় ও কতটুকু তাপ বিচ্ছুরিত করে তার উপর ভিত্তি করে বের করেন।

বেশিরভাগ গ্রহাণুই মঙ্গল ও বৃহস্পতির কক্ষপথের মাঝে অবস্থান করে সূর্য-কে পরিক্রম করায় এ এলাকে বলা হয় “প্রধান বেষ্টনি” (Main Belt) । এটিরও গঠনপ্রনালী আছে। যেমন: যদি কোনো গ্রহাণুর সূর্যকে পরিক্রমার সময় এমন হয় যে, সেটি সূর্যকে ২ বার পরিক্রম করতে যে সময় নেয়, বৃহস্পতি গ্রহ উক্ত সময়ে সূর্য-কে শুধু ১ বার পরিক্রমণ করে, তাহলে সেই গ্রহাণুটি সূর্যকে পরিক্রমার সময় বৃহস্পতি গ্রহ থেকে সাধারণত বড় মাপের যে আকর্ষণ অনুভব করত বৃহস্পতি গ্রহের পাশ দিয়ে তাকে ২ বার যেতে হয় বিধায় তা দ্বিগুণ বেড়ে যায়। ফলে এরূপ গ্রহাণু তাদের সাধারণ কক্ষপথ থেকে আলাদা হয়ে সরে যেতে থাকে। ফলে সেখানে কিছু ফাঁকা জায়গার তৈরি হয়। ১৮৫৭ সালে বিজ্ঞানী ডেনাইল ক্রিকউড (Daniel Kirkwood) এই গ্যাপটি লক্ষ করেন, তার নাম অনুসারে এ ফাঁকা জায়গার নাম রাখা হয় ক্রিকউড গ্যাপ (Kirkwood Gap)। আর বৃহস্পতির সাথে ২:১, ৩:১, ৫:২ ইত্যাদি সাধারণ ভগ্নাংশ বা অনুপাতের প্রদক্ষিণের ফলেও এরকম গ্যাপ দেখা যায়, যা প্রধান বেষ্টনির গঠনে প্রভাব ফেলে। আপনারা তো জানেন ই শনির বলয়েরও ভাগ রয়েছে। আর এভাবে শনির বলয়ের সাথে গ্রহাণুর প্রধান বেষ্টনির একটি মিল দেখা যায়।

গ্রহাণুকে আবার অন্য ভাবে গ্রুপ এ ভাগ করা যায়, যেমন: কিছু গ্রহাণুর বৈশিষ্ট্য একদম একই অর্থ্যাৎ এদের সব আচার আচরণ অভিন্ন আর এদের প্যারেন্ট বড়ি বা অরিজিন একই, এরা কোনো এক বৃহৎ বস্তুর ধ্বংসাবশেষ থেকে তৈরি সম্ভবত কোনো বড় গ্রহাণুদের সংঘর্ষে ফলে তা ভেঙে এসব ছোট গ্রহাণু তৈরি হয় এদের বলা হয় একই পরিবারভুক্ত বা গ্রুপভুক্ত গ্রহাণু। আনুমানিক সৌরজগতের এক-তৃতীয়াংশ গ্রহাণুই কোনো না কোনো পরিবারভুক্ত। যেমন : ইউরোপা ফেমিলির ৪০০ ও বেশি সদস্য রয়েছে।

অনেকেই হয়ত নানা মুভিতে দেখেছেন যে, নায়ক ভিলেন-কে আক্রমণ করার জন্য মহাকাশে স্পেইসশিপ নিয়ে এই গ্রহাণু বেষ্টনির মধ্য দিয়ে বড় বড় গ্রহাণুর ছোট ছোট ফাঁক-ফোকর দিয়ে বেড়িয়ে যায়। কিন্তু বাস্তবে এই বেষ্টনির অধিকাংশই ফাঁকা। আর এদের একে অপর থেকে অনেক দূরে অবস্থিত যে, আপনি যদি একটি গ্রহাণুর উপর দাড়ান তহলে সেখান থেকে আপনার চোখ যদি সবচেয়ে ভালোও হয় তাও খালি চোখে অন্য একটি গ্রহাণুর দেখা পাওয়া মুশকিল৷ আর এরা সংখ্যায় বেশি হলেও মোটে এত বড় নয়। আপনি যদি সব গ্রহণু গুলো একত্র করেন তাহলে তার আকার আমাদের চাঁদের চেয়ে ছোট হবে। গ্রহাণু বেষ্টনির মোট ভর চাঁদের ৪% যা, প্লুটোর থেকেও কম। এরা যে মঙ্গল থেকেও কম ভরের তা এমনিতেই বোঝা যায়, তা না হলে এরা এর চলার পথে বেশ কিছু অসুবিধা ঘটাত, সন্দেহ নেই।

গ্রহাণুদের মধ্যে “সেরেস”(Ceres) সবচেয়ে বড়। বিজ্ঞানী পিয়াজী প্রথমে এর নাম রাখেন “সেরেরে ফেরদিনানদিয়া” (Cerere Ferdinandea)। “সেরেরে” নামের উৎস হল রোমান দেবী সেরেস যিনি অঙ্কুরোদগম , ফসল ফলানো এবং মাতৃ স্নেহের দেবী। আর “ফেরদিনানদিয়া”নামটি এসেছে নেপলস ও সিসিলি’র রাজা ৪র্থ ফার্দিনান্দ-এর নামানুকরণে। কিন্তু এই নাম নিয়ে অনেকের মতবিরোধ থাকায় তার নাম রাখা হয় শুধু “সেরেস”। তার মধ্যাকর্ষণ বলের প্রভাবে এটি অনেকটাই গোলাকার। সেরেস গ্রহাণু বলয়ের একমাত্র বামন গ্রহ । মাত্র ৯৫০ কিলোমিটার ব্যাসের অধিকারী সেরেস গ্রহাণুপুঞ্জের সবচেয়ে বড় জ্যোতিষ্ক। গ্রহাণুপুঞ্জের সকল গ্রহানুর মোট ভরের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ভর রয়েছে সেরেস নিজের। সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণসমূহ থেকে জানা যায়, সেরেসের পৃষ্ঠ সম্ভবত পানি, বরফ ও পানিতে দ্রবীভূত বিভিন্ন খনিজ পদার্থের মিশ্রণ দিয়ে তৈরি । ধারনা করা হয় এর কেন্দ্র পাথুরে এবং চারপাশ ঘিরে তরল পানির মহাসাগর রয়েছে যা কিনা পৃথিবীর সব পরিষ্কার পানি থেকেও বেশি। এছাড়া কিছু বড় গ্রহাণু হল – ভেস্তা, হাইজিয়া ও পালাস। এদের ব্যাস যথাক্রমে ৫৩৪,৪৫০,৬০৮ কি.মি. 

এবার একটু “ভেস্তা”(Vesta) – তে ঘুরতে যাওয়া যাক। ভেস্তা হল ২য় বড় ও ভারী গ্রহাণু। এটির আকার গোল তবে পুরো গোল না, এই ধরেন আপনি একটি বড় গোল বলের উপর বসলে তা উপর নিচে চ্যাপ্টা ও দুপাশে যেমন একটু বের হয়ে লম্বা হবে তেমন। এটি পৃথিবী থেকে দেখতে পাওয়া গড়ে ১ম উজ্জ্বল গ্রহাণু৷ একে গভীর রাতের সম্পূর্ণ মেঘমুক্ত আকাশে খালি চোখে দেখা যায়। এর দূরত্ব সূর্য থেকে সেরেসের দূরত্বর চেয়ে একটু বেশি। এর দক্ষিণে অনেক সংঘর্ষ প্রাপ্ত হওয়ার অনেক গর্ত হয়ে গিয়েছে। তবে অনেক বিজ্ঞানী মনে করেন সেখানে আগ্নেয়গিরি রয়েছে।

এছাড়াও বিভিন্ন গ্রহাণুতে নানা স্পেসক্রাফট বেড়াতে গিয়েছে, এদের বেশিরভাগই ছিল ফ্লাই-বাই। সেসব গ্রহাণুদের মধ্যে কিছু হল : লুটেইটিসা, স্টেইন্স, গ্যাস্প্রা, আইডা ইত্যাদি। 

অবশ্য গ্রহাণুদেরও উপগ্রহ আছে। আইডা (Ida) হল প্রথম গ্রহাণু যাকে ছোট একটি উপগ্রহের সাথে দেখা মেলে, তার নাম ডেক্ট্যাইল (Dactyl)। আসলে এদের বাইনারি গ্রহাণুও বলা যায়। আরও একটা গ্রহাণুর নাম হল ক্লেওপেট্রা। এটা একটা মাজাদার আকৃতির গ্রহাণু, যাকে বলা হয় ডগ-বোন সেপ। তবে এর দুটো উপগ্রহ আছে। 

এবার আসি অন্য কথায়। আপনার হয়তো মনে হতে পারে যে এগুলো হয়তো আপনার বাগানে বা পার্কে পাওয়া বা দেখা অনেক শক্ত পাথর আসলে তা কিন্তু নয়৷

কিছু বছর আগে বিজ্ঞানীরা জানতে পারেন যে, গ্রহাণুগুলো অনেক বছর ধরে বছর একে অপরের সাথে ধাক্কাধাক্কি করে সংঘর্ষ কাটিয়ে আসছে। কখনো অনেক দ্রতগামী এক গ্রহাণু অন্য একটিরে ধাক্কা দেয়, আবার কখনো বা আস্তে। ধীরগতিতে যে সংঘর্ষ ঘটে তা অতোটা বলবৎ নয়। মানে এ সংঘর্ষের ফলে আঘাতপ্রাপ্ত গ্রহাণুর উপর ফাটল ধরে, বা তার উপরই ছোট ছোট পাথুরে খন্ড তৈরি করে কিন্তু তা ভেঙে খণ্ড খণ্ড হয়ে যায় না। এইরকম অনেক বার আঘাত খাওয়ার ফলে এমন এক অবস্থার তৈরি হয় যার ফলে তাকে বলা হয় “Rubble Pile”বাংলায় বলা হয় “পাথরের স্তূপ”। এটির মানে হল একটি বড় পাথরে অংশ নয় (যেমন: পৃথিবী) কিন্তু বিভিন্ন ছোট ছোট পাথরের সমন্বয়ে গঠিত একটি বস্তু। আঘাতের ফলে যে পাথর গুলো থাকে তা গ্রহাণুটির মধ্যাকর্ষণ বলের ফলে তার গায়ে লেগে থাকে। এই ধরেন ফেটে যাওয়া একটা গাড়ির জানালার কাচ যা আপনি হালকা চাপ দিলেই ভেঙে গুড়ি গুড়ি হয়ে পড়ে যাবে এমন শুধু কোনো রকম ভাবে টিকে আছে। ঠিক এমন অবস্থায় মধ্যাকর্ষণ বলের ফলে গ্রহাণুটি টিকে থাকে৷ তবে এর ঘনত্ব অনেক কম কারণ, এই ছোট ছোট পাথর দিয়ে তৈরি বলে এদের মাঝে ফাঁকা জায়গা আপেক্ষিক ভাবে বেশি। এই বিষয়ে আরও ভালভাবে নিশ্চিত হওয়া যায় যখন জাপানের একটি স্পেসক্রাফট “ইটাকাওয়া”নামের একটি গ্রহাণুতে বেড়াতে যায়। এই গ্রহাণুর অবস্থার বিবরণ দাওয়ার জন্য একটা কথাই যথেষ্ট আর তা হল এক “বিশৃঙ্খলাময় জগাখিচুড়ি”। আর কথা মতো এর ঘনত্বও অনেক কম।

এটা ভাবতেই অদ্ভূত লাগে যে কিছু গ্রহাণু আসলে কিছুই না বরং কিছু মুক্ত ভাবে ভাসমান নুড়ি পাথরের ব্যাগ। কি আর করার মহাবিশ্বতো আর আমাদের কথা শুনতে রাজি নয়। তবে উনি পুরাই চমকপ্রদ জিনিস।

কেন এই গ্রহাণু বেষ্টনি (Asteroid Belt) আছে বা কিভাবে হল? 

যখন আমাদের সৌরজগৎ তৈরি হচ্ছিল, আন্তঃনাক্ষত্রিক ধূলিকণার মেঘের কেন্দ্রের আশেপাশের অন্য অংশ হতে বেশি ঘনত্বপূর্ণ হওয়ার সাথে সাথে খুব দ্রুত সংকুচিত হতে থাকে। সেখানে তৈরি হয় আমাদের প্রোটোসূর্য তার পর সেখানে তাপমাত্রা বৃদ্ধি পায় এবং দৃশ্যমান আলোর দেখা মেলে। তাপমাত্রা আরও অনেক বাড়ার পর শুরু হয় নিউক্লিয় বিক্রিয়া, সৃষ্টি হয় আমাদের পরিপূর্ণ সূর্য যা মেঘটির কেন্দ্রের স্থান দখল করে নেয়। এরপর আশেপাশের সকল বস্তু চাকতির ন্যায় আকৃতি ধারণ করতে শুরু করে। আশেপাশের সকল বস্তু সূর্যকে কেন্দ্র করে ঘুরতে শুরু করে। আর সেখান থেকে তৈরি হয় গ্রহ। গ্রহ তৈরি হবার সময় এরা মেঘ থেকে অনেক বেশি উপাদান আকর্ষণ করে নিতে শুরু করে। স্বল্প ভর থেকে অধিক ভর যুক্ত হতে থাকে, আকারও বাড়াতে থাকে। আমাদের রক্ষক মানে বড় ভাই বৃহস্পতি তার আশেপাশের অধিকাংশ উপাদান আকর্ষণ করে নেয় তবে সবটুকু নয়। যেগুলো বাকি থাকে তারা ভারী উপাদান গুলো মাঝে টেনে নেয় আর হালকা উপাদান গুলো উপরের স্তরে আকর্ষিত হতে থাকে মানে তারাও গ্রহ হবার চেষ্টা চালায়। গ্রহ হবার শর্তগুলো মোটামুটি ভাবে পুরিত হয়েছিল, কিন্তু পুরোপুরি ভাবে নয়। তাই গ্রহটি গঠিত হতে পারেনি বা হয়েও স্থিরতালাভ করেনি৷ কোনো কারণে তারা মহাকাশে অজ্ঞাত বিপর্যয়ের ফলে ভেঙে হাজারো খণ্ড হয়ে যায়, সেই সম্ভাব্য বা বিনষ্ট গ্রহের দেহবস্তুই ছোট ছোট টুকরো হয়ে ওখানে ছড়িয়ে আছে, আর সূর্যকে পরিক্রমণ করছে। তাই আমরা এসব গ্রহাণু দেখি। তাদের কিছু হচ্ছে গ্রহ পঠনের এই ঘন কোর বা মাঝের অংশ থেকে আর কিছু তার ওপরের হাল্কা অংশে থেকে, তাই এদের উপাদানে ভিন্নতা পরিলক্ষিত হয়। আবার অনেকের ধারণা, গ্রহগূলির জন্মের সময় যে সব অতি ক্ষুদ্র বস্তুর সৃষ্টি হয়েছিল, হয়ত তারা কোনও কারণে জমাট বেধে বিরাট গ্রহে রূপান্তরিত হতে ব্যার্থ হয়। কিন্তু এই ভাঙাচোরা গ্রহাণুগুলি সূয্যিমামা-কে অন্যান্য ভাগ্নের (গ্রহের) মতোই প্রদক্ষিণ করতে শুরু করে দিয়েছিল। এদেরকে ব্যার্থ গ্রহও বলা হয়। এরা আবার “Minor planet” অথবা “Planetoid” গ্রুপের অন্তর্ভূক্ত।

ধারণা করা হয় যে, বিলিয়ন বছর আগে মঙ্গল ও বৃহস্পতি গ্রহের মাঝে আরো অনেক গ্রহাণু ছিল। কিন্তু সে গুলো হয় আমাদের বড় ভাই খেয়ে ফেলেছেন না হয় তার ক্ষমতা দেখাবার জন্য মধ্যাকর্ষণ দিয়ে তাদের কক্ষপথ পরিবর্তনের মাধ্যমে জোর করে বের করে দেন। অবশ্য এর ফলে হতো মঙ্গল গ্রহের আকার ছোট। কারণ মঙ্গল গ্রহ খেয়ে বেড়েওঠার সময়, বড় ভাই বৃহস্পতি তার খাদ্য মেরে দিয়েছেন।

মোটামুটি অধিকাংশ গ্রহাণুই প্রধান বেষ্টনিতে থাকে কিন্তু সব গুলো নয়। কিছু কিছু গ্রহাণু মঙ্গল গ্রহের কক্ষপথের ভেতর ঢুকে যায়। এবং অন্যান্য গ্রহাণু থেকে সূর্যের বেশি নিকটে চলে আসে। তাদের বলা হয় মঙ্গল কক্ষপথ লঙ্ঘনকারী গ্রহাণু (Mars Crossing Asteroid) বা “MAC”। আরো কিছু গ্রহাণু আছে যাদের কক্ষপথ এদের থেকেও সূর্যের অতি নিকটে। তাদের বলা হয় কি? পৃথিবী লঙ্ঘনকারী গ্রহাণু? ভাই বোকাবনে যাবেন না তদের বলা হয় অ্যাপোলো (Apollo)। এর নামকরণ করা হয় এদের জাতের প্রাপ্ত প্রথম গ্রহাণুটির নামে৷ আবার আরেক জাতের আছে তারা বলতে গেলে সরাসরি পৃথিবীর কক্ষপথের ভেতরে অবস্থান করে। এদের বলা হয় “অ্যাটেন”(Aten) গ্রহাণু। অ্যাটেন ও অ্যাপোলো গ্রুপের গ্রহাণু পৃথিবীর অনেক কাছে আসে তাই এদের বলা হয় পৃথিবীর কাছের গ্রহাণু (Near-Earth Asteroid)। “আমোর”(Amor) নামেরো আরেকটি আছে, এরা পৃথিবীর অনেক নিকটে আসে তবে এর কক্ষপথে প্রবেশ করে না, এদের অধিকাংশই মঙ্গলের কক্ষপথ ক্রস করে।

তবে এরা কাছাকাছি আছে বলে এ নয় যে এরা আমাদের আঘাত করবে৷ যেমন: এদের কক্ষপথ হয়তো বাকানো যার ফলে একেবারে সরাসারি আমাদের সাথে ওদের সাক্ষাৎ হয় না, অর্থ্যাৎ ক্রসিং হয় না। তবে কিছু গ্রহাণু আছে যারা পৃথিবীর সাথে সরাসরি সাক্ষাৎ করে তবে, তার মানে এই না যে এরা আমাদের সবসময় আঘাত করবে, মানে বিষয়টা এমন যে, আপনি তো গাড়ির সাথে ধাক্কা না খেয়ে রাস্তা পাড়ি দিতে সক্ষম হন৷ কি হন না? কিন্তু মাঝে মাঝে অ্যাক্সিডেন্ট ঘটে আর কি। যেমন: ৩ কি.মি চওড়া টোটাইস নামক এক গ্রহণু ২০০৪ সালে ১.৫ মিলিয়ন কি.মি. এর জন্য আঘাত থেকে বঞ্চিত হয়। এরো সেই একই অবস্থা। কিন্তু এর জন্য নানা জ্যোতির্বিদরা সতর্ক আছেন, তাই তারা রাতে নানা অব্জার্ভেটরিস দিয়ে আকাশকে প্রতিনিয়ত স্ক্যান করা হচ্ছে। 

অরো এক ধরনের গ্রহাণু আছে যারা ট্রোজান (Trojan) নামে পরিচিত। আগে বলি ট্রোজান কি। জ্যোতির্বিজ্ঞানে ট্রোজান হল ছোট একটি বস্তু যা বড় বস্তুটির সাথে তার কক্ষপথ ভাগাভাগি করে নেয় যা স্থিতিশীল হয়। এমন স্থিতিশীল জায়গাগুলোকে বলায় ল্যাগ্রাঞ্জ পয়েন্ট (Lagrange Point) বা এল-পয়েন্ট। ১৭৭২ সালে বিজ্ঞানী জোসেফ-লুইস-ল্যাগ্রাঞ্জ (Joseph-Louis Lagrange) “Three-body problem”সমাধানের মাধ্যমে এই পয়েন্ট গুলো আবিষ্কার করেন। এখানে ৫টা পয়েন্ট থাকে তার মধ্যে ১ম ৩ টা ( এল -১,২,৩) আপেক্ষিক ভাবে কম স্থিতিশীল মানে কিছু রাখলে তা একেবারে বরাবর পয়েন্টে না বসলে, সেটা গেছে! এই ৩টা পয়েন্ট বিজ্ঞানী লিওয়নহার্ট ইউলার (Leonhard Euler) বিজ্ঞানী ল্যাগ্রাঞ্জের কিছু বছর আগে আবিষ্কার করেন। বাকি দুটো করেন বিজ্ঞানী ল্যাগ্রাঞ্জ এবং এই ২টা পয়েন্ট (এল-৪ ও ৫) আপেক্ষিক ভাবে বেশি স্থিতিশীল। মানে, এখানে আপনি কিছু রাখলে তা পয়েন্টে একেবারে বারাবর না বসলেও চলবে। এ ৫টি পয়েন্টের মধ্যে আপনি যাই রাখবেন তা ২ বস্তুর থেকে সমান মধ্যাকর্ষণ বলের ফলে তা যেকোনো একটি বস্তুর দিকে যাবে না কারণ আকর্ষণ বল দু দিক থেকে তাকে সমান ভাবে টানছে তাই তা আজীবন সেখানেই থেকে যাবে। ট্রোজানরা এই এল-পয়েন্টে গুলোর ৪ ও ৫ নং পয়েন্ট-এ বিদ্যমান। এই পয়েন্ট গুলো ৬০° কোণে আসল বস্তুর কক্ষপথে সামনে ও পেছনে থেকে বড় বস্তুকে কেন্দ্র করে ঘোরে। গ্রহ ও উপগ্রহের মধ্যেও এই পয়েন্ট কাজ করে, তাই সেখানেও ট্রোজান থাকতে পারে। যেমন : শনির ৪ টি ট্রোজান মুন বা চাঁদ আছে৷ 

আমাদের সৌরজগতের মধ্যে যেসব ট্রোজান আছে তা মধ্যে বেশিরভাগ ট্রোজান এ বৃহস্পতি গ্রহের কক্ষপথে অবস্থিত। কারণ, আমাদের সৌরজগতে সূর্য ও বৃহস্পতি হলো সবচেয়ে ভারী বস্ত এবং যার ফলে তা লাগান্সের থিওরির সাথে মিলে যায়। বৃহস্পতি গ্রহের কক্ষপথে অবস্থিত যেসব ট্রোজান এর ৬০° সামনে বা আগে থাকে তাদের নামকরণ করা হয় গ্রিক পৌরানিকের নায়কদের নাম অনুসারে। আর যারা ৬০° পেছনে তাদের নাম দেওয়া হয় গ্রীক ট্রোজান সেনাপতিদের নামানুসারে। তবে, একত্রে এরা ট্রোজান গ্রহাণু নামে পরিচিত। আরেকটা বিষয়, উক্ত ৫ এল-পয়েন্ট বৃহস্পতি গ্রহের সাথে সমান তালে সূর্যকে প্রদক্ষিণ করে। বৃহস্পতির আনুমানিক ১ মিলিয়নেরও বেশি ট্রোজান আছে এবং তারা ১ কি.মি. থেকেও বেশি বড়। এর চেয়েও বেশি ট্রোজান থাকতে পারে যা বিজ্ঞানীরা দেখেন নি, কারণ গ্রহাণুরা অনেক অনুজ্জ্বল, অনেক দূরে এবং পৃষ্ঠতল কালো। ধারণা করা হয়, সৌরজগৎ সৃষ্টির সময় কিছু আন্তঃনাক্ষত্রিক ধূলিকণার মেঘ থেকে সৃষ্ট কঠিন বস্তু গুলো বৃহস্পতির এল-পয়েন্ট এ আটকা পরে যায়, আর তখন থেকেই সেখানে আছে। 

বড় ভাই বৃহস্পতি ছাড়াও অন্যান্য গ্রহেরও ট্রোজান আছে। যেমন: মঙ্গলের ৯টি, নেপচুনের ২২ টি, ইউরেনাসের ২ টি ও পৃথিবীর ১ টি৷ 

পৃথিবীরটি আবিষ্কার করা হয় ২০১০ সালের অক্টোবর মাসে। এটি WISE বা (Wide-field Infrared Survey Explorer) দিয়ে আবিষ্কার করা হয় যা অবলোহিত আলো ব্যাবহার করে মহাবিশ্বের নানা বস্তুর ছবি নেয় বা স্ক্যান করে। এর নাম “2010 TK7 “। এর ব্যাসার্ধ ৩০০ মি. ৮০০ কি.মি. দূরে। এ কক্ষপথের মধ্যে সূর্যকে প্রদক্ষিণ করে ও পৃথিবীর কক্ষপথের সামনে বা আগে অবস্থান করে। অবশ্য এছাড়াও কিছু গ্রহাণু আছে যা, পৃথিবীর কক্ষপথে ঢুকে পড়ে কিন্তু পৃথিবীর কক্ষপথের সাথে সূর্যকে প্রদক্ষিণ করে না৷ তাদের নিজের আলাদা কক্ষপথ রয়েছে যা, উপ-বৃত্তাকার এবং হেলানো। যার ফলে তারা পৃথিবীর কাছাকাছিই থাকে কিত্তু আমাদের পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করে না৷ তারা অবশ্য অনেক সময় আমাদের কাছে আসে আবার দূরে চলে যায়। এটি অবশ্য একটু অদ্ভুত। তবে তা অরবিটাল মেকানিক্স-এর সাধারণ বিষয়। কিছু মানুষ এই গ্রহাণুদের পৃথিবীর চাঁদ বলেন কিছু তা নয়, তবে বলা যায় এরা আমাদের সাথে কো-অরবিটালে যুক্ত। এমন গ্রহাণু খুবই কম তবে এর মধ্যে নামকরা একটি হল “কুয়েনিয়া” (Cruithne)। এটি যখন আমাদের কাছাকাছি আসে তখন পৃথিবী ও তার মধ্যে ১২ মিলিয়ন কি.মি. এর পার্থক্য থামে।

আরেকটা কথা, গ্রহাণুদের নাম মূলত দেবিদের নামে হয়ে থাকে যেমন : সেরেস, ভেস্তা, জুনো ইত্যাদি। কিন্তু এদের সংখ্যা এত বেশি হয়ে যায় যে, তা আর দেবিদের নাম দিয়ে কুলানো যায় নি। তাই অনেক প্রসেস করে আন্তর্জাতিক জ্যোতির্বিজ্ঞান বিভাগের পারমিশন নিয়ে কোনো জ্যোতির্বিদ যে গ্রহাণু আবিষ্কার করে তারা তাদের পছন্দের নাম দেন৷ উনারা নামের সাথে নানা নাম্বার ও দেন। অনেক জ্যোতির্বিদরা তাদের নামের সাথে মিলিয়েও আবিষ্কৃত গ্রহাণুটির নাম রাখেন। 

তথ্যসূত্র:

১. Astronomy Today – Chassion McMillan

২. রহস্যময় মহাকাশ – আবু তাহের।

৩. https://en.m.wikipedia.org/

৪. YouTube