Loading...

তৃপ্তি হোটেল

Support Us or Donate Some Love for Us



লোকে বলে আঁধার ঘনালে নাকি সূর্যোদয় হয় তবে রাজনের কাছে তা নিছক রূপকথার মত।কারণ প্রতি রাতের পরই যেন সে আবার একটি যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি শুরু করে।এই যুদ্ধ
ঢাল তলোয়ার কিংবা বন্দুক দিয়ে যুদ্ধ করা নয়, এ যুদ্ধ তো বাঁচার জন্য যুদ্ধ । এ যুদ্ধ তিনবেলা নয় শুধু একবেলা পেটপুরে খাওয়ার লড়াই। রাজন মোগলাই পরোটার দোকানে টেবিল মোছার কাজ করে ‌। কেউ ঠাট্টা করে ওর নাম “রাজন” কেন জিজ্ঞেস করলে রাজন বলে , ‘বাপ মাগো কাসে তো সব পোলারাই রাজপুত্তুর ‘। রাজন কমলাপুর ৭ নং লেনে মা আর তিন বোন মিলে থাকে।মা ছাই বেঁচত , রোজগার এত ভালো হতনা , তাই এখন মানুষের বাসায় কাজ করে।তিন মেয়ের বিয়ে দিতে পারলেই যেন জীবন থেকে অনেক বড় একটা বোঝা নামে।রাজনের আবার বোনদের বিয়ে টিয়ে নিয়ে কোনো মাথাব্যথা নেই।আসলে যেসব ছেলেদের হাতে শৈশবের নাটাইঘুড়ির বদলে দোকানের টেবিল মোছার ছেড়া গামছা ওঠে তাদের আবেগ থাকাটা বানরের চাঁদে যাওয়ার শখের মতো। এসকল শৈশবহীন কিশোরেরা স্বপ্ন দেখার সুযোগ পায় না। রাজনও তাদেরই একজন।

মোগলাই পরোটার যে দোকানে রাজন কাজ করে তার নাম ” তৃপ্তি হোটেল ” যে শব্দটার সঙ্গে তার খুব একটা পরিচয় নেই। মানুষ পেট পুড়ে খাওয়ার দৃশ্য দেখলে আগে তাকিয়ে থাকলেও এখন ক্ষুধা ও তার কাছে অনেকটাই হার মেনে নিয়েছে। মানুষের একটার পর একটা মোগলাই খাওয়া দেখে আগে করিম মিয়াকে জিজ্ঞেস করতো   “এতো ক্যামনে খায় করিম ভাই আমারে তো হাফ দিলেই পেট ভইরা যায় ” । তাদের খাওয়ার দিকে তাকিয়ে থাকতো ও। তখন করিম মিয়ার থাপ্পড় খাওয়ার পর আবার বাস্তবতার এই পৃথিবীতে আগমন হতো রাজনের । করিম মিয়া বলতো “”তোর কী, মানুষ খাইলে সবার তো আর তোগো মতো ছনের ঘরে জন্ম হয় না “। রাজন কথা বলে না । এসব কথা ওর গায়েই লাগে না প্রতিবাদ করা তো দূরের কথা। করিম মিয়া মানুষটাকে ওর ভালো না লাগলেও যেদিন একটা মোগলাই আর পরোটা দিয়ে আগের দিনের বেঁচে যাওয়া খানিকটা আলুর ভর্তা খেতে দেয় ঐদিন করিম মিয়ার মতো আর কেউ ভালো মানুষ হয় না রাজনের কাছে। খাবারের সাথেই তো তাদের আত্মার সম্পর্ক। এ যেন‌ এক অবোধ ক্ষুধার্ত কিশোরের আত্মতৃপ্তি।

বাড়ি ফেরার পথে ল্যাম্পপোস্টের নিচে বেশ কয়েকদিন ধরেই একজন বয়স্ক লোকেকে দেখতে পাচ্ছিল সে । আজ হঠাৎ একটু খোঁজ নেয়ার ইচ্ছ জাগলো রাজনের। জানলো লোকটির নাম আজহার। বয়স পঁচাত্তর ছুঁই ছুঁই। আজহার চাচাকে পরিবারের কথা জিজ্ঞেস করলেই তার একটিই উত্তর ,” আমার কেউ নাইরে বাপ আমার কেউ নাই” । রাজন তাকে দেখেই বুঝলো প্রায় অসার এই শরীরটাতে আর চোখ দিয়ে দু ফোঁটা জল ফেলারও শক্তি নেই। রাজনের হঠাৎ নিজের বাবার কথা মনে পড়ে। তার মতে নিষ্ঠুর এই পৃথিবী টাকা ছাড়া কিছুই বোঝে না। মানুষের ধার দেনার কর্জের বোঝার এই টানাটানিতে জীবন নামক দড়িটাই যে ছিড়ে গিয়েছিল রাজনের বাবার। হঠাৎ আজহার চাচা বলে ওঠে ” জীবনের সব সম্বল দিয়ে দুইটা ছেলে মেয়েরে মানুষ করসিলাম বাপ। এখন মানুষ হওয়ার পর আমার ঠিকানা হইলো রাস্তা ” । পরে জানা ‌গেলো আজহার চাচার সব জমিজমা লিখে নিয়ে নিঃসম্বল বাবাকে ছেড়ে অন্য দেশে পাড়ি জমিয়েছে তার ছেলে মেয়ে। এসব শুনে রাজনের হঠাৎ করিম মিয়ার কথাটা মনে পড়ে ।সে  রাজনকে বলেছিল ” সবার তো আর তোগো মতো ছনের ঘরে জন্ম হয় না।” আজহার চাচার জন্ম হয়তো ছনের ঘরে হয় নি কিন্তু রাজন তো তাও বেশ ভালোই আছে,  দর কষাকষির এই পৃথিবীতে। সে তো প্রতিদিন তাও স্বপ্ন দেখে তৃপ্তি নিয়ে একবেলা খাওয়ার।সে তো হার মানতে জানে না , বরং লড়াই করে কীভাবে বাঁচতে হয় তা ক্ষুধা তাকে শিখিয়ে দিয়েছে।  নিজের বাপের সাথে থাকার সৌভাগ্য তার হয় নি। তবে তার বাপ হয়তো আজহার চাচার মতোই হতো। এই নিয়ে সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতে ঘরের পথে হাঁটা দেয় সে। সকালে আবার ছুটতে হবে তৃপ্তি হোটেলে। স্পেশাল নেহারীর অর্ডার আছে, আলু ছেলা এখনো বাকি…………….